• সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২১ অপরাহ্ন

জ্বালানি খাতে দুর্নীতির জাল: এসপিএম ও ইস্টার্ন রিফাইনারি প্রকল্পের অন্ধকার গল্প

স্টাফ রিপোর্টার / ১১৪ Time View
Update : বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬

জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ খাতে সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির খবর সকলেরই কম বেশি জানা, তবে আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরবো চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অফশোর থেকে সরাসরি ক্রুড অয়েল সরবরাহের জন্য স্থাপিতব্য সিঙ্গেল পয়েন্ট মোরিং (এসপিএম) নির্মাণ, ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-২ সংক্রান্ত দুর্নীতির তথ্য, এবং কিভাবে কতিপয় অসৎ-দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিদের কারণে রাষ্ট্র ভয়াবহ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়, সেসবের বিস্তারিত।

চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে জাহাজ থেকে সরাসরি ক্রুড অয়েল স্থানান্তরের জন্য একটি সিঙ্গেল পয়েন্ট মোরিং (এসপিএম) স্থাপনের জন্য সিদ্ধান্ত নেয় আওয়ামী সরকার আর এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ২০১০ সালে বাংলাদেশের অনুরোধে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ২৩৭ মিলিয়ন ইউএস ডলার ঋণ দিতে সম্মত হয় এবং এর ধারাবাহিকতায় জার্মান কনসাল্টেন্ট ‘আইএলএফ’ মতামত প্রদান করে যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য এই পরিমাণ অর্থ যথেষ্ট নয়, এই পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী সরকার আইএলএফ এর পরামর্শে লোনটি ৩০০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার অনুরোধ করে।

এই প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় নসরুল হামিদ বিপু বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বপ্রাপ্ত হন এবং দ্রুতই এই প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য চায়নাকে অনুরোধ করেন এবং চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (সিপিপি) এই প্রকল্পে অর্থায়নে রাজি হয়।

প্রকৃত দুর্নীতির সূত্রপাত ঘটে এখান থেকেই, নসরুল হামিদ উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগসাজশে নতুন কিছু আইটেম যোগ করে প্রকল্পের কলেবর অপ্রয়োজনীয় ভাবে কিছুটা বৃদ্ধি করেন। প্রাথমিকভাবে উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক একটি পাইপ লাইনের সুপারিশ করা হলেও পরবর্তীতে এখানে আরো একটি পাইপলাইন যোগ করা হয় এবং সেই সাথে অপ্রয়োজনীয় ভাবে একটি সাম্প ট্যাঙ্ক স্থাপন করার প্রস্তাব করা হয়। দূরভিসন্ধিমূলকভাবে অপ্রয়োজনীয় এইসব যন্ত্রপাতি যোগ করার আসল কারণটি দ্রুতই সামনে চলে আসে যখন চাইনিজ প্রতিষ্ঠান, প্রকল্পটির ব্যয় ৯০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করে এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন ছলচাতুরির মাধ্যমে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্পটি ৫৮৬ মিলিয়ন ডলারে চূড়ান্ত করা হয়।

চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের আগে মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সিপিপি এর যোগ্যতা যাচাই-বাছাই নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, সেই পরিপ্রেক্ষিতে চাইনিজ কোম্পানিটির কাছে তাদের সাব-সি পাইপ লাইন এবং সিঙ্গেল পয়েন্ট মোরিং (এসপিএম) স্থাপনের অভিজ্ঞতার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তারা একটি বেশ রিমোট আফ্রিকান কান্ট্রিতে এই ধরনের কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা জানায়।

বিষয়টি সরজমিনে যাচাই-বাছাই এবং পর্যবেক্ষণের জন্য মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধিদল ওই আফ্রিকান দেশটি ভিজিট করেন এবং সিপিপি এর এই ধরনের কাজের দাবির কোন সত্যতা খুঁজে পান না। অতঃপর মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দলটি চাইনিজ কোম্পানির অভিজ্ঞতার বিষয়ে একটি নেগেটিভ রিপোর্ট উপস্থাপন করেন, এতে তৎকালীন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু ক্ষুব্ধ হয়ে ওই রিপোর্টটি বাতিল করে জোরপূর্বক একটি পজিটিভ রিপোর্ট দেওয়ার জন্য প্রতিনিধিদলের সদস্যদের নির্দেশ প্রদান করেন। নিজ চাকরি ও জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে এই প্রতিনিধি দলের সদস্যরা মন্ত্রীর নির্দেশ পজিটিভ রিপোর্ট উপস্থাপনের কোন বিকল্প না থাকায় তাহারা তাই করেন।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে মালয়েশিয়া সরকার দুর্নীতির অভিযোগে সিপিপি’র সাথে চুক্তি বাতিল করে ও দেশটিতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হতে ২৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার জব্দ করে।

পরবর্তীতে কোন প্রকার প্রতিযোগিতা ছাড়াই কেবল সিপিপি প্রদত্ত দরের উপর নেগোসিয়েশন করে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। ইতোমধ্যে সিপিপি’কে ৪ বার প্রকল্পের প্রাইস এসক্যালেশন অনুমোদন দেওয়া হয়, যার ফলে ৩০০ মিলিয়ন ডলারে প্রাক্কলিত একটি প্রকল্পের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার, অথচ এখন পুরো প্রকল্পটিই স্থবির হয়ে গেছে। কেবলমাত্র এই একটি এসপিএম নির্মাণ করতেই রাষ্ট্রের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় করা হয়েছে।

আলোচিত এই এসপিএম প্রকল্পের দুর্নীতিতে নসরুল হামিদ বিপুর অন্যতম সহযোগী ছিলেন এনায়েতুল্লাহ খান, যিনি এখনো জ্বালানি খাতের বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য পেতে ব্যাপকভাবে তৎপর।

এসপিএম করা হয়েছিল মূলত ডিপ সি’কে থাকা জাহাজ থেকে তেল আনার সময় ও ব্যয় কমিয়ে আনার লক্ষ্যে— কারণ ডিপ সি থেকে তেল স্থলভাগে আনতে সময় লাগে কয়েকদিন। যেহেতু মাদার ভ্যাসেল বন্দর পর্যন্ত আসে না, তাই মাদার ভ্যাসেল থেকে লাইটার জাহাজে করে বন্দরে আনাতে খরচ হয় প্রচুর। আর এসপিএমের মাধ্যমে তেল আসবে ভিন্ন পদ্ধতিতে। গভীর সমুদ্রে তেলের জাহাজ থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে তেল খালাস করা হবে। সেই তেল পাইপ লাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম ইস্টার্ন রিফাইনারিতে আসবে, আর সেখান থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে ঢাকায় চলে আসবে তেল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে তেলের সিস্টেম লসের নামে চুরি কমবে। সড়কের পরিবহন ব্যয় যেমন কমবে, তেমনি সাগর থেকে তেল খালাসের সময় ও ব্যয় কমবে। এ লক্ষ্যে কক্সবাজার চট্টগ্রাম পাইপ লাইন ও চট্টগ্রাম ঢাকা পাইপ লাইন নির্মাণের কাজ বহু আগেই শেষ হয়েছে। এভাবে সাগর থেকে তেল খালাস করায় বছরে ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।

জানা গেছে, ২০২৪ সালের মার্চ মাসে পরীক্ষামূলকভাবে এসপিএম চালু করা হয়। এর কয়েক মাসের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর এসপিএম চালু করার বিশেষ আগ্রহ দেখায়নি গত ইন্টেরিম সরকার। গত সরকার এসপিএমের অপারেটর নিয়োগ দেওয়ার জন্য নামমাত্র আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে তবে সে দফায় মাত্র দুটি দরপত্র জমা পড়ে, তার একটি আবার যোগ্যই ছিল না। ফলে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা এসপিএম আর চালু করা যায়নি, ফেলে রাখায় এর মূল্যবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হবার উপক্রম হয়েছে।

জ্বালানি সক্ষমতা অর্জনের জন্য ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-২ স্থাপনের কোন বিকল্প নেই তারপরও প্রশ্ন হচ্ছে গত ১২ বছর আগে সরকার এই ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-২ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিলেও এখনো কেন এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলো না? উত্তর হচ্ছে, সেখানেও রয়েছে এই নসরুল হামিদ বিপু, এনায়েতুল্লাহ খান ও সালমান এফ রহমানের কালো হাত।

প্রসঙ্গত, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নির্মাণের কাজটি পায় ফরাসি প্রতিষ্ঠান থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস। এই প্রতিষ্ঠানটিতে ইতালিরও মালিকানা রয়েছে। এই স্যাটেলাইট নির্মাণে খরচ হয়েছিল ৩ হাজার কোটি টাকা। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানটির লোকাল এজেন্ট ছিল সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো।

একই ধারাবাহিকতায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-২ এর কাজটি পায় ফ্রান্সের আরেক প্রতিষ্ঠান টেকনিপ। সেটিরও লোকাল এজেন্ট ছিলেন সালমান এফ রহমান। অথচ একই সময় চীনের দুটি কোম্পানি ‘বিল্ড অন অপারেশন’ মডেলে অনেক কম খরচে বানিয়ে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু রাজি হননি প্রতিমন্ত্রী বিপু, সালমান রহমান ও এনায়েতউল্লাহ খান। শেষ পর্যন্ত তারা বেশি দাম দিয়েই টেকনিপের সাথে চুক্তি করে।

প্রকল্পের প্রাথমিক অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ৪২ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ফ্রেঞ্চ কোম্পানি টেকনিপ কে কোন প্রকার টেন্ডার ছাড়াই একক ভাবে ফ্রন্ট এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন (ফিড) এর জন্য কন্ট্রাক্ট দেওয়া হয়।

প্রচলিত আইন এবং সরকারের পলিসি অনুসারে উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কখনো একই প্রতিষ্ঠান হতে পারে না তারপরেও এইসব নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে টেকনিপ কে প্রকল্প বাস্তবায়নের কন্ট্রাক্ট দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অবশেষে প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য টেকনিপ অতি উচ্চ সুদ হারের একটি প্রস্তাবনা উপস্থাপন করলে তা ইআরডি কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয় ফলে প্রকল্পটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

এই চক্র এতটাই শক্তিশালী ছিলো যে, ক্ষমতাসীনদের অতি প্রিয় এস আলম গ্রুপ ২০২৩ সালের দিকে একটি প্রস্তাব দেয় যে, তারা ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-২ নির্মাণ করে দেবে, এ জন্য যত বিনিয়োগ সেটাও এস আলম গ্রুপ করবে, তবে সে জন্য এস আলমকে ৬০ শতাংশ মালিকানা দিতে হবে— এমন একটি প্রস্তাবটি সেসময় খোদ শেখ হাসিনার কার্যালয় ইতিবাচক নোট দিয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয় পাঠায়।

তবে নসরুল হামিদ বিপু, এনায়েতউল্লাহ খান ও সালমান এফ রহমানের সিন্ডিকেট এই ফাইল পাস না করার জন্য বিপিসির চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেন, তৎকালীন বিপিসির চেয়ারম্যান ছিলেন শামসুর রহমান। বিপিসি যেহেতু ইস্টার্ন রিফাইনারির মালিক, তিনি এই যুক্তি দেন যে সরকারি মালিকানায় থাকা ইস্টার্ন রিফাইনারির ইউনিট-২ এর মালিকানা এস আলমের মত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে ছাড়া যাবে না, তাতে আইনগত জটিলতা তৈরি হবে। আর বিপিসির এমন অবস্থানের কারণেই এস আলমের প্রস্তাবও ভেস্তে যায়।বিপু পলাতক, সালমান এফ রহমান কারাগারে থাকলেও এনায়েতুল্লাহ খান আশ্চর্যজনকভাবে এখনো সক্রিয়, তার বিরুদ্ধে নেওয়া হয়নি কোনো তদন্তের উদ্যোগ বা কোন আইনি ব্যবস্থা, বরং তিনি এখন দৌড়ঝাঁপ করছেন কিভাবে জ্বালানি সেক্টরে আবার জেঁকে বসা যায়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category