কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার ছোট আজলদী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে বিধি-বিধান উপেক্ষা করে প্রধান শিক্ষকের স্ত্রীকে কম্পিউটার শিক্ষিকা পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া তদন্তে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তদন্ত কর্মকর্তা সরেজমিনে তদন্তে গিয়ে নিরপেক্ষতা বজায় না রেখে অভিযুক্তদের মাধ্যমেই ‘আপ্যায়িত’ হয়েছেন।
জানা গেছে, উপজেলার ছোট আজলদী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের স্ত্রী আয়েশা আক্তার মনিকে বিধি-বিধান ও যোগ্যতা যাচাই ছাড়াই অবৈধভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মর্মে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও নারান্দী ইউনিয়ন ছাত্রদলের আহ্বায়ক মো. ইজাজুল হোসেন (ইমন)।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত ৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নির্দেশের প্রেক্ষিতে এই তদন্ত কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগকারী ইজাজুল হোসেন তার অভিযোগে উল্লেখ করেন যে, ২০১৬ সালে কোনো প্রকার স্বচ্ছতা ও নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই প্রধান শিক্ষক তার স্ত্রীকে এই পদে নিয়োগ দান করেন। গত ২০ এপ্রিল দুপুরে পাকুন্দিয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. ওমর ফারুক ভূঞার নেতৃত্বে একটি তদন্ত দল বিদ্যালয়ে সরেজমিনে এই তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে। তবে অভিযোগকারী ইজাজুল হোসেন তদন্ত কমিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, তদন্ত করতে এসে অভিযুক্ত শিক্ষিকার বাড়ি দুপুর খাবার খেয়েছে তদন্ত কমিটির লোকজন।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ রাসেল মিয়া বলেন, “আমার বাড়ি স্কুলের পাশেই। এখানে নিয়মিত ক্লাস হয় না বললেই চলে। ছাত্র-ছাত্রীরা ক্লাস চলাকালীন বাইরে ঘুরাঘুরি করে, কিন্তু তাদের শাসনের কোনো ব্যবস্থা নেই। এমনকি শিক্ষকদেরও দায়িত্ব পালনে অনীহা দেখা যায়। এই প্রতিষ্ঠানটি যাতে সঠিক নিয়মে চলে এবং আমাদের সন্তানরা যাতে ভালোভাবে লেখাপড়া করতে পারে, সেটাই আমাদের দাবি।”
অভিভাবক মোহাম্মদ আলম মিয়া অভিযোগ করে বলেন, “শিক্ষকরা সময়মতো ক্লাসে না নিয়ে নিজেরা আড্ডায় ব্যস্ত থাকেন। স্কুলের নিয়ম তোয়াক্কা না করে দুপুর আড়াইটার মধ্যেই ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়, ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে না। এটি এক ধরনের পেশাগত দুর্নীতি। আমরা এই অনিয়মের প্রতিকার ও সঠিক বিচার দাবি করছি।”
আহসান উল্লাহ রোমান নামে এক যুবক বলেন, দুইদিন আগে এই বিদ্যালয়ে শিক্ষা অফিসারের আগমন ঘটেছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, তদন্তে এসে তিনি বিদ্যালয়ের লোকজনের সাথে ব্যক্তিগতভাবে খাওয়া-দাওয়ায় ব্যস্ত ছিলেন। এমনকি তিনি তাদের বাড়িতে গিয়েও ভিআইপি আপ্যায়ন গ্রহণ করেছেন এবং আমাদের সাথে কোনো কথা না বলেই চলে গেছেন। একজন তদন্ত কর্মকর্তা যদি নিজেই এভাবে আপ্যায়িত হন, তবে সেই তদন্ত কতটা সঠিক হবে তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ আছে। আমরা চাই প্রশাসন বিষয়টি অবগত থাকুক এবং তদন্ত যেন নিয়ম অনুযায়ী স্বচ্ছতার সাথে করা হয়।”
অভিযোগকারী নারান্দী ইউনিয়ন ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইজাজুল হোসেন (ইমন) বলেন,”সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই আমরা এই অনিয়মের প্রতিবাদ করছি। আয়েশা আক্তারের নিয়োগটি সম্পূর্ণ অবৈধ; কারণ কোনো বিজ্ঞপ্তি বা রেজুলেশন ছাড়াই তৎকালীন সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর বড় প্রমাণ হলো, একই পদে পরবর্তীতে এনটিআরসিএ (NTRCA) থেকে অন্য একজনকে নিয়োগ দেওয়া। আমরা এই নিয়োগ বাতিলসহ প্রধান শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”
এ বিষয় কথা বলতে স্কুলের অফিস (প্রধান শিক্ষকের শ্বশুর বাড়ির ‘কাছারি ঘর’) এ গেলে সাংবাদিক দেখে প্রধান শিক্ষক শ্বশুরের বসত ঘরে পালিয়ে যায়।
অনেকক্ষণ পর প্রধান শিক্ষকের স্ত্রী অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষিকা আয়েশা আক্তার মনি এসে কথা কথা বলেন, তবে তিনি ক্যামারা সামনে কথা বলতে অস্বীকার করেন। সহকারী শিক্ষিকা আয়েশা আক্তার মনি। তার দাবি, অভিযোগকারী ইজাজুল সোহেন (ইমন) তার কাছে আড়াই লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করেছেন। চাঁদা না দেওয়ায় ফেসবুকে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমি বিএ পাস করে এবং সরকার অনুমোদিত কম্পিউটার কোর্স সম্পন্ন করেই বিধি মোতাবেক নিয়োগ পেয়েছি। আমরা বিদ্যালয়ের জমিদাতা, আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে এই ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।” বিষয়টি তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্যকেও অবগত করেছেন বলে জানান।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. ওমর ফারুক ভূঁইয়ার সঙ্গে ফোনে কথা হলে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে আমি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম এবং সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। তদন্ত প্রতিবেদন এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি; কাগজপত্র হাতে পেলে বিস্তারিত পর্যালোচনা শেষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তদন্ত চলাকালীন আপ্যায়নের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি আরও বলেন, ‘তদন্তকাজে গিয়ে খাওয়া-দাওয়ার প্রশ্নই আসে না। সেখানে স্বচ্ছতার সঙ্গেই কাজ করছি। অভিযোগকারী তরুণের আচরণ ও কথাবার্তা সন্তোষজনক নয় এবং সে ভিত্তিহীন তথ্য ছড়াচ্ছে।'”
এ বিষয়ে পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুপম দাস বলেন,”এই বিষয়টি নিয়ে আমরা সম্প্রতি একটি অভিযোগপত্র পেয়েছি। সেখানে সম্ভবত ২০১৬ সালের একটি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও অভিযোগের স্বপক্ষে কোনো দালিলিক প্রমাণ বা নথিপত্র এখনো আমাদের কাছে পেশ করা হয়নি। বিষয়টি অধিকতর তদন্তের জন্য আমি ইতিমধ্যে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে দায়িত্ব দিয়েছি। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”