• শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ অপরাহ্ন
সর্বশেষ:
টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল) প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে নথিপত্র সংগ্রহ করেছে দুদক দেড় হাজার কোটি টাকার সুফল প্রকল্পে দুর্নীতির নথিপত্র সংগ্রহ দুদকের দুর্নীতির দায়ে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বরখাস্ত অনেক গুরুতর প্রশ্নের মুখে সাহাবুদ্দিন সাবেক রাষ্ট্রপতির অতীত কার্যক্রম যাচাই করে আইনি ব্যবস্থা: আইনমন্ত্রী একাধিক নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক পুলিশ কর্মকর্তার, বিচার দাবি স্ত্রীর সাংবাদিক শফিকের মুক্তি না দিলে শাহবাগ থানা, ফায়ার সার্ভিস ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি ২ কোটি টাকার চেক ডিজঅনার মামলায় রিজেন্ট হাসপাতালের সাহেদ কারাগারে এনবিআরে ৩ কমিশনারের পদে রদবদল, কাস্টমস গোয়েন্দায় নতুন মহাপরিচালক জিয়াউলের ভবনে সাদা সোনাসহ শত কোটি টাকার সম্পদের প্রমাণ পেয়েছে দুদক

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে দুর্নীতির মহোৎসব

স্টাফ রিপোর্টার / ১৫৬ Time View
Update : রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬

দেশের শ্রম খাতের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান প্রতিষ্ঠান ‘কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর’ (DIFE) এখন অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। নিয়োগ জালিয়াতি থেকে শুরু করে বদলি বাণিজ্য এবং কলকারখানার লাইসেন্স প্রদান—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঘুষের বিনিময়ে ফাইল ছাড় করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক (IG) ওমর মোঃ ইমরুল মহসিনের বিরুদ্ধে। এমনকি এই দুর্নীতিতে খোদ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবের নাম জড়িয়ে পড়ায় প্রশাসনের অন্দরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
জব্দ ৪০০০ খাতা: নিয়োগ বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য
সম্প্রতি অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষার খাতা নিয়ে বড় ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। সূত্র মতে, প্রায় ৩০ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য জায়েজ করতে মহাপরিচালকের পছন্দের কর্মকর্তাদের দিয়ে খাতা নিরীক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ১০ এপ্রিল শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব প্রায় চার হাজার নিয়োগ পরীক্ষার খাতা জব্দ করে রাজধানীর শাহজাহানপুর থানায় হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন। তবে বর্তমানে অভিযোগ উঠেছে, সচিব মোঃ আব্দুর রহমান তরফদারকেও বিশেষ প্রক্রিয়ায় ‘ম্যানেজ’ করে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পায়তারা চলছে।
দুর্নীতির ‘ফিরিস্তি’: পদে পদে ঘুষ
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের পরিদর্শক থেকে শুরু করে উপ-মহাপরিদর্শক পদ পর্যন্ত পদোন্নতি বা সুবিধাজনক স্থানে বদলির জন্য ১০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। এমনকি কারখানার প্রকারভেদে ঘুষের অংক নির্ধারিত হয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বা ISO সনদ নিতেও মহাপরিদর্শককে নির্দিষ্ট অংকের কমিশন দিতে হয় বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন। গত ১৫ এপ্রিল চারজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার রহস্যজনক বদলিকে কেন্দ্র করে প্রায় ২ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
নেপথ্যে স্ত্রী ও ‘ছায়া’ ক্যাশিয়ার
অনুসন্ধানে জানা যায়, মহাপরিদর্শক ওমর মোঃ ইমরুল মহসিনের দুর্নীতির সাম্রাজ্য পরিচালনায় প্রধান ভূমিকা পালন করছেন তার স্ত্রী মুনা চৌধুরী এবং মাহবুব নামক এক রহস্যময় ব্যক্তি। মুনা চৌধুরী নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের পদধারী নেত্রী হওয়া সত্ত্বেও এখনো প্রভাব খাটিয়ে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে মাহবুব অফিসের কোনো স্থায়ী কর্মচারী না হয়েও মহাপরিদর্শকের সকল গোপন লেনদেন ও দাপ্তরিক কাজ তদারকি করেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মূলত অধিদপ্তরের বদলি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রিত হয়।
পুরনো পাপ ও পদোন্নতির রহস্য
ইমরুল মহসিনের দুর্নীতির ইতিহাস দীর্ঘদিনের।
২০১৬ সাল: খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ইউজিসি’র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য থাকাকালীন ১০ লাখ টাকা সম্মানী দাবির অভিযোগে তাকে কাজ থেকে বিরত রাখা হয়েছিল।
২০২৩ সাল: কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পরিচালক থাকাকালীন নিয়োগ জালিয়াতিতে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে।
অবাক করার বিষয় হলো, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল হলেও রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তি ও দুর্নীতির প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তিনি বহাল তবিয়তে আছেন এবং পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়েছেন।
ঝুঁকির মুখে শ্রম খাত ও আন্তর্জাতিক ইমেজ
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি বা তাজরীন গার্মেন্টসের অগ্নিকাণ্ডের পর আন্তর্জাতিক চাপে এই অধিদপ্তরকে শক্তিশালী করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে পরিদর্শকরা কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার চেয়ে ঘুষ আদায়ে বেশি মত্ত। চেকলিস্ট অনুযায়ী অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বা শিশুশ্রম তদারকির বদলে ১০০০ টাকা থেকে শুরু করে লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিয়ে অবৈধ কারখানাকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে দেশের রপ্তানিমুখী শিল্প খাত বিশ্ববাজারে ভাবমূর্তির সংকটে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের আর্তনাদ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, “আমরা অসাধু কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি। ঘুষ না দিলে ফাইল নড়ে না, আর প্রতিবাদ করলে দুর্গম এলাকায় বদলি হতে হয়।” আয়কর নথিতে উল্লেখ না থাকলেও বেনামে গাড়ি, বাড়ি ও বিপুল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন এই মহাপরিদর্শক—এমনটাই দাবি সংশ্লিষ্টদের।
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে ওমর মোঃ ইমরুল মহসিনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। দেশের কলকারখানাগুলোতে নিরাপদ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে অবিলম্বে এই ‘দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট’ ভাঙার জোর দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী উদ্যোক্তারা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category