• মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৩ অপরাহ্ন

অনিয়ম থেকে দুর্নীতি: এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিমের বিতর্কিত কর্মজীবন

স্টাফ রিপোর্টার / ৫০৩ Time View
Update : সোমবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২৫

অনিয়ম দিয়ে শুরু, দুর্নীতিতে শেষ—এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিমের কর্মজীবন আজ আলোচনার কেন্দ্রে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে মাত্র ২৭ দিনের জন্য দায়িত্ব পালনের সময় তিনি নিয়োগ-বদলির মাধ্যমে সাত কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। চাকরির শুরুতেই অনিয়ম, এবং শেষেও দুর্নীতির ছাপ স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, তার বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে।

জাবেদ করিম ৩ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে রুটিন দায়িত্বে যোগ দেন। যদিও নিয়োগ ছিল সংক্ষিপ্ত, তিনি অফিসে তেমন সরব ছিলেন না। অফিস কর্মচারীদের মতে, তিনি সাধারণত চুপচাপ বসে থাকতেন, প্রয়োজনীয় ফাইলগুলোতে সই করতেন, নাহলে মধ্যাহ্নভোজ সেরে অফিস ত্যাগ করতেন। তার দৈনন্দিন কার্যক্রম প্রায়শই সীমিত ছিল এবং তার অফিসে উপস্থিতি মূলত প্রশাসন শাখার কাজ দেখার জন্য। তবে হঠাৎ ২৬ নভেম্বর তিনি সক্রিয় হন। অভিযোগ আছে, ওইদিন তিনি চুপিসারে সপ্তম তলায় তার প্রাক্তন কার্যালয়ে যান এবং বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্য সম্পন্ন করেন। প্রশাসন শাখার সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শফিক আহমেদ এবং কিছু সহকারী প্রকৌশলী ও উপজেলা প্রকৌশলীকে কাজে লাগিয়ে এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

অভিযোগ অনুসারে, এই স্বল্প সময়ে পরিচালিত নিয়োগ ও বদলি কার্যক্রমে কমপক্ষে সাত কোটি টাকা বাণিজ্য হয়েছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, এই হঠাৎ তৎপরতার পেছনে থাকতে পারে চাকরির মেয়াদ সম্প্রসারণের উদ্দেশ্য। এছাড়া, তার নিজ জেলা নোয়াখালীর রাস্তাঘাট সংস্কারের জন্য বিশেষ বরাদ্দ হিসেবে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা অনুমোদনের বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায় যে, একজন রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী কি এই ধরনের বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষমতা রাখতেন।

জাবেদ করিমের চাকরি জীবনের শুরুতেই অনিয়ম লক্ষ্য করা গেছে। কুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিএসসি চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগেই তিনি এলজিইডির রাজস্ব খাতের সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পান। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে, বিএসসি ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস আবশ্যক। ফল প্রকাশের আগেই নিয়োগ পাওয়া স্পষ্ট নিয়োগ বিধি লঙ্ঘন। নিয়োগ বিধি অনুযায়ী এ ধরনের অনিয়ম প্রমাণিত হলে চাকরি বাতিল, বেতন-ভাতা ফেরত নেওয়া, এমনকি কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব ছিল। তবে রহস্যজনক কারণে এই বিধি প্রয়োগ করা হয়নি।

জাবেদ করিমের রাজনৈতিক প্রভাবও তার ক্ষমতার উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তার বাবা ছিলেন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের একজন প্রভাবশালী প্রকৌশলী। সেই পরিচয় ও প্রভাবের কারণে তিনি সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী ছিলেন লক্ষ্মীপুরের জিয়া উল হক জিয়া। জুনিয়র সহকারী প্রকৌশলী থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে জাবেদ করিম জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পান। প্রথমে তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী শহিদুল হাসান এটি অগ্রহণযোগ্য হিসেবে উড়িয়ে দেন। তবে প্রতিমন্ত্রীর চাপের মুখে তিনি শেষ পর্যন্ত দায়িত্বে স্থায়ী হন। এই অতিরিক্ত দায়িত্ব তিনি দুই বছরের পরিবর্তে প্রায় পাঁচ বছর ধরে চালিয়ে যান। এই সময়ে তিনি জেলার উন্নয়ন তহবিল ও কার্যাদেশ নিয়ন্ত্রণ করেন।

দুর্নীতির অভিযোগ অনুসারে, এই সময়ে জাবেদ করিম শত কোটি টাকা আয় করেন। ২০০৭ সালে এক-এগারো সময় সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও রাজনীতিক গ্রেপ্তার হন। জাবেদ করিমের নামও তালিকায় উঠে আসে। তবে অদৃশ্য ইশারায় তিনি উচ্চশিক্ষার নামে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। এরপরও দেশে দীর্ঘকাল আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকেন। জনশ্রুতি ছিল যে, গণভবনে তার অবাধ যাতায়াত ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পরিবর্তনের পর তিনি রাতারাতি রাজনৈতিক দিক পরিবর্তন করেন।

জাবেদ করিম অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সড়ক ও সেতুর নতুন নির্মাণ বা সংস্কার কার্যক্রম প্রায় শূন্য ছিল। তবে তিনি রেকর্ড পরিমাণ বিল পরিশোধ দেখিয়ে দিয়েছেন। অভিযোগ আছে, প্রকল্প পরিচালক পদের জন্য ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ‘দেনা’ নেওয়া হতো। নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রেও কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।

জাবেদ করিমের এই কার্যক্রমের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে তার শেষ কর্মদিবসের দুপুরে ৩০ নভেম্বর পরিচালিত বদলি ও নিয়োগ কার্যক্রম। অফিস সূত্র জানায়, তিনি চুপিসারে প্রশাসন শাখা থেকে ফাইল সংগ্রহ করে সপ্তম তলায় তার প্রাক্তন কার্যালয়ে গিয়ে বিভিন্ন বদলি ও নিয়োগ আদেশে সই করেন। সংস্থার কিছু কর্মচারী অভিযোগ করেছেন, এই সময় তার কাছ থেকে প্রশাসন শাখার সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শফিক আহমেদ এবং কিছু সহকারী ও উপজেলা প্রকৌশলী বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন।

রুরাল ট্রান্সপোর্ট আপগ্রেডেশন প্রজেক্টে (আরইউটিডিপি) ফারুক আহমেদকে প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ফারুক আহমেদকে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি বলেন, ‘আমি বাইরে আছি, পরে ফোন দেব।’ কিন্তু পরবর্তীতে তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি। একইভাবে জাবেদ করিমের ফোনও কল ফরওয়ার্ড অবস্থায় ছিল।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জাবেদ করিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তার দুর্নীতিতে অর্জিত সম্পদ হাজার কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। কিছু সূত্রে বলা হচ্ছে, তিনি এসব সম্পদ বিদেশে পাচার করেছেন। তার এই সম্পদের উৎস ও পরিচালনার স্বচ্ছতা নিয়ে সরকারের কাছে বড় প্রশ্ন চিহ্ন রয়েছে।

জাবেদ করিমের কর্মকাণ্ড এলজিইডি ও স্থানীয় সরকারের নিয়োগ, বদলি এবং বরাদ্দ প্রক্রিয়ার দুর্বল দিকগুলোকে উন্মোচন করেছে। নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য, বিশেষ বরাদ্দে অনিয়ম, এবং বিদেশে সম্পদ পাচারের অভিযোগ সরকারের স্বচ্ছতা এবং জনগণের আস্থা বজায় রাখার জন্য জরুরি তদন্তের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।

দুপুরে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে তিনি যা করেছেন, তা নিয়ে কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা লক্ষ্য করা যায়। এলজিইডির বহু কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, ২৬ ও ৩০ নভেম্বরের ঘটনা অফিসে দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে দিয়েছে। এই কয়েকটি দিনের মধ্যে পরিচালিত কার্যক্রম পুরোপুরি নিয়মবহির্ভূত এবং অনৈতিক বলে চিহ্নিত হয়েছে।

জানা গেছে, জাবেদ করিমের কর্মজীবনের শুরু থেকেই নিয়োগ বিধি লঙ্ঘন ঘটেছিল। বিএসসি চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগেই সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পাওয়া তার প্রথম বড় অনিয়ম। তৎকালীন প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ এবং নিয়োগ সংক্রান্ত বিধি অনুযায়ী এরকম নিয়োগ বাতিল করা সম্ভব হলেও তা করা হয়নি। এর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব এবং পারিবারিক প্রভাব কাজ করেছে বলে সংবাদে উল্লেখ আছে।

এলজিইডি কর্মচারীরা জানিয়েছেন, জাবেদ করিমের তৎপরতা এবং দূরদর্শী পরিকল্পনা পুরো প্রতিষ্ঠানকে বিস্মিত করেছে। তিনি অফিসে চুপচাপ বসে থাকলেও হঠাৎ করেই নিয়োগ এবং বদলির বিপুল বাণিজ্য সম্পন্ন করেছেন। তার আচরণ এবং কার্যক্রমের বৈপরীত্য অফিসে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

সরকারি নথি এবং স্থানীয় সূত্রগুলো দেখাচ্ছে, জাবেদ করিমের কর্মকাণ্ডে নিয়োগ-বদলি, বিশেষ বরাদ্দ এবং প্রকল্প বরাদ্দে নিয়মবহির্ভূত কার্যক্রম স্পষ্ট। এই পরিস্থিতি তদন্ত এবং স্বচ্ছতা রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এলজিইডি এবং সরকারের জন্য এটি একটি সতর্কবাণী যে, সরকারি নিয়োগ এবং বরাদ্দ প্রক্রিয়ার দুর্বলতা দুর্নীতিকে উদ্দীপিত করতে পারে।

ফলে দেখা যায়, জাবেদ করিমের চাকরি জীবন একটি প্রতীক, যেখানে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক শৃঙ্খলার অভাব এবং স্বার্থপর উদ্দেশ্য মিলিত হয়ে প্রতিষ্ঠান এবং দেশের অর্থনৈতিক স্বচ্ছতাকে প্রভাবিত করেছে। তার শুরু ছিল অনিয়ম, শেষ হলো দুর্নীতিতে। এই ঘটনাগুলো এলজিইডি ও স্থানীয় সরকারের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করছে।

চাকরি জীবনের এই অল্প সময়ের মধ্যে পরিচালিত কার্যক্রম, নিয়োগ-বদলির বাণিজ্য, এবং কোটি কোটি টাকার বিরোধপূর্ণ বরাদ্দের তথ্য প্রমাণ করছে যে, সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলার দুর্বলতা কতটা বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। এলজিইডি এবং সরকারের জন্য এটি একটি বড় শিক্ষণীয় ঘটনা যে, শৃঙ্খলাবদ্ধ নিয়ন্ত্রণ এবং স্বচ্ছতা ছাড়া সরকারের কর্মপদ্ধতি দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে।

এখানে শুধু নিয়োগ-বদলি বা বরাদ্দের কথা নয়, বরং প্রশাসনিক সংস্থাগুলোর মধ্যে সাংগঠনিক শৃঙ্খলার অভাব এবং রাজনৈতিক প্রভাব কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা এই ঘটনা স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করছে। এলজিইডি কর্মকর্তারা এবং স্থানীয় সরকার কর্মীরা এ ঘটনার ফলে সতর্কতা অবলম্বন করছেন এবং ভবিষ্যতে নিয়োগ এবং বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন।

অবশেষে, জাবেদ করিমের কর্মকাণ্ড সরকারী নিয়োগ, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, দুর্নীতি এবং সম্পদ প্রাপ্তি সংক্রান্ত এক জটিল অধ্যায় তৈরি করেছে। তার কর্মজীবন চিত্রায়ন করছে, যেখানে নিয়মবিরোধী নিয়োগ, বিপুল সম্পদের অর্জন এবং রাজনৈতিক প্রভাবের মিলিত প্রভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সরকারের কার্যক্রম প্রভাবিত হয়েছে। এই ঘটনা সরকারের স্বচ্ছতা, জনগণের আস্থা এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য বড় প্রশ্নচিহ্ন উত্থাপন করছে।

জাবেদ করিমের কর্মকাণ্ড প্রমাণ করছে, সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের সীমাবদ্ধতা কতটা জরুরি। এই প্রেক্ষাপটে এলজিইডি এবং সরকারের জন্য এটি একটি শিক্ষণীয় ঘটনা, যেখানে ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর না হলে সংস্থা এবং দেশের অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা বিপন্ন হতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category