গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইডেন বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দুর্নীতির ছায়া সম্প্রতি নতুনভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুস সাত্তার চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) সংক্রান্ত কাজের অনুমোদনের নাম করে কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্য করেছেন।
গত জুলাই মাসে নির্বাহী প্রকৌশলী সাত্তারের বদলি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি এবং তদবিরের মাধ্যমে নিজের দায়িত্ব পালনের সময় আরও এক মাস বাড়ান। এই সময়েই চলতি অর্থবছরের প্রায় ৯ কোটি টাকার কাজ তড়িঘড়ি অনুমোদন দেন ঠিকাদারদের। অভিযোগ, এসব কাজের বিনিময়ে তিনি ঠিকাদারদের কাছ থেকে ১০ শতাংশ কমিশন গ্রহণ করেছেন, যা এক মাসেই প্রায় ৯০ লাখ টাকার মতো।
সরকারি নথি অনুযায়ী, ইডেন গণপূর্ত বিভাগ সচিবালয়ের নয়টি ভবনের সংস্কারের জন্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৫০-এর বেশি কাজের তালিকা তৈরি করেছে। এই কাজগুলির জন্য মোট খরচ দেখানো হয় প্রায় ২২ কোটি টাকা। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এদের একটি বড় অংশ বাস্তবে সম্পন্ন হয়নি। এমনকি একই ভবনের একই ফ্লোরে একাধিক কাজকে ভাগ করে দেখানো হয়েছে বারবার খরচ করার উদ্দেশ্যে।
গত তিন বছরে বিভাগে সংস্কার কাজের নামে মোট ৬০ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অনেক কাজই কাগজপত্রে সীমাবদ্ধ থেকেছে। বিশেষ করে দরজা-জানালা মেরামত, রঙ করা এবং ছোটখাটো সংস্কারের নাম ব্যবহার করে বিল তৈরি করা হয়েছে, তবে বাস্তবে সেই কাজ করা হয়নি।
তথ্য ও সূত্রের ভিত্তিতে দেখা যায়, প্রকৌশলী সাত্তার ও অন্যান্য কর্মকর্তারা ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে কাজ না করেই বিল উত্তোলন করেছেন। কাজের অনুমোদন দেওয়ার সময় ঠিকাদাররা তাঁর কাছে কমিশন প্রদান করতেন। মূলত, পুরো প্রক্রিয়াটি “গোপন দরপত্র” বা “ডামি চুক্তি” আকারে পরিচালিত হয়েছে।
যেমন, এক বছরের মধ্যে ৯ কোটি টাকার কাজ অনুমোদনের ভিত্তিতে ঠিকাদাররা ১০ শতাংশ কমিশন হিসেবে মোট ৯০ লাখ টাকা প্রদান করেছে। এছাড়াও, অন্যান্য প্রকৌশলীর সঙ্গে ভাগাভাগি করে আরও কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে বলে সূত্র জানাচ্ছে।
সরেজমিন তদন্ত ও প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী দেখা গেছে, অনেক কাজের বাস্তব অস্তিত্ব নেই। একই ভবনের একই ফ্লোরে একাধিক কাজকে ভিন্ন ভিন্ন নামের খাতে দেখানো হয়েছে। বিশেষ করে অর্থবছরের শেষ দুই মাসে—মে ও জুন—বেশিরভাগ কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, বছরের শেষ সময়ে তৎপরতার নামে অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
এছাড়াও, সচিবালয়ের অভ্যন্তরের আটটি ভবনের সংস্কারের জন্য গত অর্থবছরে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কিছু কাজ না করেই কাগজে সম্পন্ন দেখানো হয়েছে। ফলে প্রায় ৫ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে, যার বড় অংশ ভাগ পেয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী সাত্তারসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা।
সরকারি সূত্র বলছে, প্রকৌশলী সাত্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগের পেছনে প্রমাণভিত্তিক তথ্য রয়েছে। এক কর্মকর্তা জানান, “যদি সরেজমিন তদন্ত করা হয়, এই অনিয়মের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাবে। কাজের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল মাত্র কয়েক দিন বা ঘন্টার মধ্যে, যা সাধারণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।”
ঠিকাদারদের কথায়, কমিশন প্রদান ছাড়া কোন কাজ কার্যক্রমের অনুমোদন পাওয়া সম্ভব নয়। এমনকি কিছু ঠিকাদার স্বীকার করেছেন, তারা বাধ্য হয়ে কমিশন প্রদান করেছিলেন। সূত্র জানায়, “বছরের শুরুতে অনুমোদিত কাজগুলো তুলনামূলকভাবে কম খরচের হয়, কিন্তু বছরের শেষ সময়ে বড় বড় কাজ অনুমোদিত হয় এবং কমিশন সংগ্রহের সুযোগ বৃদ্ধি পায়।”
ইডেন গণপূর্ত বিভাগে বছরের পর বছর ধরে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে শুরু করে প্রতি অর্থবছরে দরজা-জানালা মেরামত, রঙ করা এবং ছোটখাটো সংস্কারের নামে বিল তৈরি হলেও বাস্তবে কাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
গত তিন বছরের হিসাব অনুযায়ী, সংস্কার কাজের নামে মোট ১৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। শুধুমাত্র কমিশন বাবদ প্রকৌশলী সাত্তারের প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারি নথি ও ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সরেজমিন তদন্ত করলে সব অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া সম্ভব।
বিতর্কিত এই নির্বাহী প্রকৌশলী সাত্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও সম্প্রতি তাকে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এ নতুন পোস্টিং দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক সূত্রের মতে, এটি এক ধরনের পদক্ষেপ, যা বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে তিনি দায়িত্ব থেকে সরাসরি বিচ্যুত হননি।
সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, “যদি সঠিক তদন্ত করা হয়, প্রকৌশলী সাত্তারের অনিয়ম স্পষ্টভাবে ধরা পড়বে। এটি শুধু এক ব্যক্তি নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার একটি উদাহরণ, যেখানে স্বচ্ছতা এবং দায়িত্বশীলতার অভাব রয়েছে।”
এই ধরনের কমিশন বাণিজ্য শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং সরকারি প্রকল্পের গুণগত মানেও প্রভাব ফেলে। সংস্কার কাজ না হওয়ায় ভবন ব্যবহারে অসুবিধা তৈরি হয়, নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকে এবং ভবিষ্যতে পুনরায় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়।
ইডেন গণপূর্ত বিভাগে কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্য শুধু এক ব্যক্তি নয়, বরং একটি ব্যবস্থাগত দুর্নীতির দৃষ্টান্ত। সরেজমিন তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ না হলে, এই ধরনের অনিয়ম ভবিষ্যতেও চলতে পারে। জনগণের টাকায় সঠিক খরচ নিশ্চিত করা এবং সরকারি প্রকল্পের স্বচ্ছতা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।