• শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ০২:৫৮ অপরাহ্ন
সর্বশেষ:
সচিব হতে ৩৩ কোটি টাকার চুক্তি হতে পারলে সুদ দিবেন ৮৬ কোটি টাকা ৬ তলা বাড়ি সহ ১০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা রাসেল কবির সনদ জালিয়াতি থেকে কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ, তবুও বহাল তবিয়তে মালা খান! দুর্নীতির অভিযোগে বদলি কর্মকর্তার পক্ষে ফেসবুক পোস্ট, নিজেও ‘একই অপরাধ’ করার দাবি খাদ্য কর্মকর্তার দুর্নীতি রুখতে নয়া ভাবনা, জি–রামজি প্রকল্পে ফেস রেকগনিশন স্থানীয় সরকারে ১৭ বছরের দুর্নীতির অনুসন্ধানে ৭ সদস্যের কমিটি টেন্ডার না পেয়ে দুর্নীতির অভিযোগ, তদন্তে মিলছে ভিন্ন চিত্র বিপিসি চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব ও তার স্ত্রীর শত কোটি টাকার সম্পদ, ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ স্থানীয় সরকার বিভাগের ১৭ বছরের অনিয়ম-দুর্নীতি খুঁজতে সাত সদস্যের কমিটি এলজিইডিতে ‘৬ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি’: পিরোজপুরে বন্ধ উন্নয়নকাজ শুরু হবে ঈদের পর

দুর্নীতির অভিযোগে কেনাকাটা আটকে দিয়েছিলেন নাহিদ, তোড়জোড় ফয়েজ আহমদের

স্টাফ রিপোর্টার / ১১৮ Time View
Update : রবিবার, ২৭ জুলাই, ২০২৫

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) একটি প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম প্রকল্পের কেনাকাটার প্রক্রিয়া আটকে দেন। দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থাও করেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান শেষ হওয়ার আগেই এখন সেই প্রকল্পে যন্ত্রপাতি কেনার তোড়জোড় করছেন প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। তাঁর বিরুদ্ধে দুদককে প্রভাবিত করার অভিযোগও উঠেছে।

বিটিসিএলের ওই প্রকল্পে দুদক গত ৯ জানুয়ারি অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। এ জন্য দুদকের পরিচালক এস এম এম আকতার হামিদ ভূঁইয়াকে প্রধান করে গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিটি কাজ করছে। অনুসন্ধান চলার মধ্যেই যাতে কেনাকাটা করা যায়, সে জন্য দুদকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করেছেন ফয়েজ আহমদ। তাঁকে চিঠিও দিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে এই প্রকল্পে কেনাকাটা করতে বিশেষ কৌশলের আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

বিটিসিএলের প্রকল্পটির নাম ‘৫-জি উপযোগীকরণে বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন’, যা ফাইভ-জি রেডিনেস প্রকল্প নামে পরিচিতি। বিটিসিএল সারা দেশে অপটিক্যাল ফাইবার (বিশেষ তার) ও যন্ত্রপাতি বসিয়ে তা ইন্টারনেট সেবাদাতাদের কাছে ভাড়া দেয়। নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে তারা সেই সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছিল।

বিটিসিএল ও দুদক সূত্র জানায়, প্রকল্পটি নেওয়া হয় ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। মোট ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে যন্ত্রপাতি কেনার ব্যয় ৪৬৩ কোটি টাকা। সেই সময় দরপত্রে অংশ নেওয়া তিনটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রস্তাব মাত্র চার দিনে মূল্যায়ন করে চীনা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে টেকনোলজিসকে ৩২৬ কোটি টাকার কাজ দেওয়া হয়। তখন অভিযোগ উঠেছিল যে দরদাতাদের কেউই দরপত্রের শর্ত পূরণ করতে পারেনি। তারপরও কারিগরি কমিটি সবাইকে যোগ্য ঘোষণা করে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সমীক্ষা অনুসারে অনুমোদিত ডিপিপি (প্রকল্প প্রস্তাব) ভঙ্গ করে প্রয়োজনের চেয়ে পাঁচ গুণ সক্ষমতার যন্ত্রপাতি কেনার উদ্যোগ নিয়ে অর্থ অপচয় চেষ্টার অভিযোগও ওঠে। এ ছাড়া মূল্যায়নের গোপন তথ্য ফাঁস করে তৎকালীন মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার ও তৎকালীন সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামানের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের ঘটনাও ঘটে। বিটিসিএলের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসাদুজ্জামান এসব কারণে প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী নতুন করে দরপত্রের সিদ্ধান্ত দেন। গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে প্রভাব বিস্তারের দায়ে দুই চীনা প্রতিষ্ঠানের দরপত্রও বাতিল করেন।

অনুসন্ধান চলার মধ্যেই যাতে কেনাকাটা করা যায়, সে জন্য দুদকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করেছেন ফয়েজ আহমদ। তাঁকে চিঠিও দিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে এই প্রকল্পে কেনাকাটা করতে বিশেষ কৌশলের আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

মোস্তাফা জব্বার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) পর্যালোচনা সভায় দরপত্র বাতিলের সিদ্ধান্ত মেনে নেন। এ নিয়েই মোস্তাফা জব্বারের সঙ্গে তখনকার টেলিযোগাযোগসচিবের বিরোধ তৈরি হয়। সচিব বিটিসিএলের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে পর্ষদের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসাদুজ্জামানের ওপর চাপ দেন। ব্যর্থ হয়ে শেষমেশ তাঁকে অপসারণ করে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দেন। নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ করে চীনা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়েকে কাজ দেন।

নথিপত্রে দেখা যায়, তৎকালীন যুগ্ম সচিব তৈয়বুর রহমান ই-মেইল করে প্রকল্প পরিচালক থেকে দরপত্রের সর্বশেষ পরিস্থিতির একটি চিঠি আনান। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ থেকে সেই চিঠি পরিচালনা পর্ষদে উত্থাপনের নির্দেশ আসে। পর্ষদের মাধ্যমে আসাদুজ্জামানের ওপর চাপ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে আবু হেনা মোরশেদ জামান ও তৈয়বুর মিলে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্মার্ট বাংলাদেশের অদম্য অভিযাত্রা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ নামে একটি বই লিখে তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উৎসর্গ করেন।

২০২৪ সালের জুনে আবু হেনা মোরশেদ জামানকে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব হিসেবে পদায়ন করা হয়। বর্তমান সরকার তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে। তৈয়বুর বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের যুগ্ম সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং পাশাপাশি ইডিজিই (এনহ্যান্সিং ডিজিটাল গভর্নমেন্ট অ্যান্ড ইকোনমি) প্রকল্পের পরিচালক ও জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যন্ত্রপাতি ফাইভ-জির উপযোগী কি না এবং ১২ বছর সেবা দেবে কি না, তা বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে যাচাই করা হবে। আবার হুয়াওয়ের দেওয়া প্রস্তাব মেনে নিয়ে চুক্তির জিসিসি ক্লজ ৩৮ দশমিক ৪ (কারখানা পরিদর্শন ছাড়া সরবরাহ-সংক্রান্ত) অনুযায়ী পণ্য জাহাজীকরণ করবে বলে জানান।

আইসিটি অবকাঠামো নিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে যাবেন।

এমন পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৮ মে হুয়াওয়ে বিটিসিএলকে দেওয়া একটি চিঠিতে জানায়, কারখানা পরিদর্শনের অনুমতি সরকারের সর্বোচ্চ মহল দেয়নি বলে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে জেনেছে। তাই তারা নিজেরাই যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করে সনদ জমা দেবে। আবার ১৯ মে জানায়, যেহেতু কারখানা পরিদর্শন হচ্ছে না, তাই এ বাবদ বরাদ্দ অর্থ সমন্বয় করা হবে। হুয়াওয়ে পণ্য জাহাজীকরণের অনুমতির অনুরোধও জানায়।

নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, হুয়াওয়ে ১৫ মে তারিখের যে স্মারকের চিঠির কথা উল্লেখ করেছে, তা বিটিসিএল ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের মধ্যে আদান-প্রদান করা। এ চিঠি কীভাবে হুয়াওয়ে পেল, তা জানতে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশ কার্যালয় থেকে প্রথম আলোকে লিখিত বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। তারা দাবি করেছে, তারা গত ১৫ মে প্রকল্প দপ্তর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে (ফরোয়ার্ডিং) একটি চিঠি পায়। সেই চিঠির মাধ্যমেই তারা জানতে পারে যে কারখানা পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

বিটিসিএলের দাপ্তরিক চিঠি কীভাবে হুয়াওয়ের কাছে গেল, তা জানতে বিটিসিএলের কাছে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হয় ২১ জুলাই। গতকাল পর্যন্ত তার জবাব পাওয়া যায়নি।

এদিকে বিটিসিএল যন্ত্রপাতি জাহাজিকরণের অনুমতি চেয়ে হুয়াওয়ের চিঠির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের মতামত চায়। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ গত ২৫ মে বিটিসিএলকে দেওয়া এক চিঠিতে ফয়েজ আহমদের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যন্ত্রপাতি ফাইভ-জির উপযোগী কি না এবং ১২ বছর সেবা দেবে কি না, তা বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে যাচাই করা হবে। আবার হুয়াওয়ের দেওয়া প্রস্তাব মেনে নিয়ে চুক্তির জিসিসি ক্লজ ৩৮ দশমিক ৪ (কারখানা পরিদর্শন ছাড়া সরবরাহ-সংক্রান্ত) অনুযায়ী পণ্য জাহাজীকরণ করবে বলে জানান। নিয়ম হলো, কারখানায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা অসম্ভব হলেই কেবল বিটিসিএল ক্রেতা হিসেবে কারখানায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে সরঞ্জাম জাহাজীকরণের অনুমতিপত্র দেবে। কিন্তু তারা তা দেয়নি; বরং ফয়েজ আহমদের নির্দেশনা সমন্বিত ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের চিঠিটি সরাসরি হুয়াওয়েকে পাঠিয়ে দেন প্রকল্প পরিচালক (২৬ মে)।

এ সুযোগে হুয়াওয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশে সরঞ্জাম পাঠিয়ে দেয়। বিষয়টি চিঠি পাঠিয়ে বিটিসিএলকে জানায় তারা (১৬ জুন। হুয়াওয়ের চিঠি অনুযায়ী, যন্ত্রপাতি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর সম্ভাব্য দিন ছিল ২২ জুন। অবশ্য সরঞ্জাম চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে কি না, নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, তাদের কাছে আমদানির কোনো নথি জমা পড়েনি। ফলে টাকা ছাড় করার কোনো প্রশ্ন এখনো আসেনি। দুদক এর আগে তাদের কাছ থেকে নথিপত্র সংগ্রহ করেছে। এমন অবস্থায় আমদানির নথিপত্র জমা পড়লে টাকা ছাড় করবে কি না, তা নিয়ে দোটানায় রয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

যে প্রকল্পের কেনাকাটা দুদক অনুসন্ধান করছে, সেই কেনাকাটার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া দুর্নীতি সহায়ক। সরকার বলছে, সরঞ্জাম না কিনলে বড় লোকসান হবে। সে ক্ষেত্রে কি কোনো কস্ট-বেনিফিট অ্যানালাইসিস (ব্যয়ের বিপরীতে সুফল পর্যালোচনা) হয়েছে?

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান

‘দুর্নীতি সহায়ক’

বিটিসিএল এখন যদি যন্ত্রপাতি গ্রহণ না করে, তাহলে আইনি জটিলতার মুখে পড়তে হতে পারে। অন্যদিকে গ্রহণ করলে তাতে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় ও দুর্নীতির আশঙ্কা রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, যে প্রকল্পের কেনাকাটা দুদক অনুসন্ধান করছে, সেই কেনাকাটার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া দুর্নীতি সহায়ক। সরকার বলছে, সরঞ্জাম না কিনলে বড় লোকসান হবে। সে ক্ষেত্রে কি কোনো কস্ট-বেনিফিট অ্যানালাইসিস (ব্যয়ের বিপরীতে সুফল পর্যালোচনা) হয়েছে? তিনি বলেন, উচিত ছিল সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি দিয়ে প্রকল্পটি পর্যালোচনা করা। সেটা না করে কেনাকাটার দিকে এগিয়ে যাওয়ায় সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক যে, এ ক্ষেত্রে ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category