সামিট গ্রুপে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ব্যবসায়ীক অংশীদারিত্ব রয়েছে বলে দাবি করেছেন কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের। সামিট কমিউনিকেশনে সজীব ওয়াজেদ জয়ের মালিকানা রয়েছে। আদালতের কাছে উভয়পক্ষের স্বাক্ষর করা একটি চুক্তিতে জয় তার স্ত্রীকে এককালীন ১ মিলিয়ন ডলার প্রদান করবেন তাও উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৪ থেকে ২০৩৪ সাল পর্যন্ত প্রতিমাসে ক্রিস্টিনাকে ২০,০০০ ডলার করে দেবেন বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছেন।
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পূর্বে অপ্রকাশিত বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত নথিতে বহুমিলিয়ন ডলারের আর্থিক সমঝোতা, করপোরেট শেয়ার হস্তান্তর এবং বাংলাদেশের বড় টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ দাবির বিষয় উঠে এসেছে।
সম্প্রতি ফাঁস হওয়া সজীব ওয়াজেদ জয় ও তার সাবেক স্ত্রী ক্রিস্টিন ওয়াজেদের বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত নথিতে ১০ লক্ষ ডলারের (প্রায় ১২ কোটি টাকা) এককালীন অর্থ প্রদান, দীর্ঘমেয়াদে মাসে ২০ হাজার ডলার স্পাউজাল সাপোর্ট এবং ডিগিকন টেকনোলজিস ও ফিনটেক সলিউশন্সের শেয়ার হস্তান্তরের তথ্য উঠে এসেছে।
তার সাবেক স্ত্রী ক্রিস্টিন ওয়াজেদের সঙ্গে হওয়া এই চুক্তিতে এক দশকব্যাপী আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি, ডিগিকন টেকনোলজিস ও ফিনটেক সল্যুশনসের ব্যবসায়িক স্বার্থ বণ্টন এবং সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেড সম্পর্কিত সম্ভাব্য অর্থপ্রাপ্তির ওপর একটি ট্রাস্ট কাঠামোর বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
২২ পৃষ্ঠার চুক্তিপত্রের ১৩ থেকে ১৫ নম্বর পৃষ্ঠায় থাকা নথিগুলোতে বিবাহবিচ্ছেদের পর ব্যবসায়িক স্বার্থ ও আর্থিক দায়বদ্ধতা কীভাবে ভাগ করা হবে তার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।
জয় ২০২৫ সালের শুরুর দিকে তার ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেন যে, আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদের প্রায় তিন বছর আগেই তাদের আলাদা থাকা শুরু হয়েছিল।
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ডিগিকন টেকনোলজিস লিমিটেড ও ফিনটেক সল্যুশনস লিমিটেডকে ঘিরে। সেখানে বলা হয়েছে, চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব জয় তার মালিকানাধীন উভয় প্রতিষ্ঠানের ৫০ শতাংশ শেয়ার ক্রিস্টিন ওয়াজেদের কাছে হস্তান্তর করবেন।
নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ক্রিস্টিন তার অংশ পাওয়ার আগে জয় এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো শেয়ার তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি বা হস্তান্তর করতে পারবেন না।
শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হওয়ার পর উভয় পক্ষ নিজ নিজ নামে নিবন্ধিত শেয়ারের একক মালিকানা বজায় রাখবেন এবং সংশ্লিষ্ট দায়, কর ও ব্যয় পৃথকভাবে বহন করবেন।
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, সমঝোতার পর উভয় পক্ষ তাদের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ব্যবসা থেকে অর্জিত আয়, ইকুইটি বা সম্পদের মূল্য নিজেদের কাছে রাখবেন।
চুক্তির আরেকটি বড় অংশ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো কোম্পানি সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেডকে কেন্দ্র করে।
সমঝোতা নথিতে উল্লেখ করা হয়, সামিট কমিউনিকেশনস ২০০৯ সালে কার্যক্রম শুরু করে এবং “শুধুমাত্র এই চুক্তির প্রয়োজনে” জয় স্বীকার করেছেন যে, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বৈবাহিক সম্পত্তির সম্পর্ক রয়েছে।
নথি অনুযায়ী, সামিট কমিউনিকেশনসের মালিকরা প্রতিষ্ঠানটি বিক্রির চেষ্টা করেছিলেন এবং জয় আশা করেছিলেন যে, এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ও প্রচেষ্টার কারণে তিনি ভবিষ্যতে অর্থ বা শেয়ার পেতে পারেন।
নথি অনুযায়ী, সামিট কমিউনিকেশনসের মালিকরা প্রতিষ্ঠানটি বিক্রির চেষ্টা করেছিলেন এবং জয় আশা করেছিলেন যে, এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ও প্রচেষ্টার কারণে তিনি ভবিষ্যতে অর্থ বা শেয়ার পেতে পারেন।
চুক্তি অনুযায়ী, তাদের মেয়ে সোফিয়ার কল্যাণে একটি ট্রাস্ট গঠন করা হবে। সামিট কমিউনিকেশনস বিক্রি বা মালিকানাসংশ্লিষ্ট যেকোনো “নিট অর্থপ্রাপ্তি” থেকে ৩০ শতাংশ ওই ট্রাস্টে জমা হবে।
এই বাধ্যবাধকতা জয়ের মালিকানাধীন বা প্রতিষ্ঠিত অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান, ট্রাস্ট বা ব্যবসার মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
চুক্তিতে কার্ট গ্রুয়েলকে ট্রাস্টি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং জয় ও ক্রিস্টিন ওয়াজেদকে বিকল্প ট্রাস্টি হিসেবে রাখা হয়েছে। ট্রাস্টের অর্থ সোফিয়ার “স্বাস্থ্য, শিক্ষা, রক্ষণাবেক্ষণ ও সহায়তা” খাতে ব্যয় হবে।
চুক্তিতে “যদি, যেমন এবং যখন প্রাপ্ত হয়” বাক্যাংশটি বিশেষভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সামিট কমিউনিকেশনস থেকে জয় প্রকৃত অর্থ বা সম্পদ পাওয়ার পরই ৩০ শতাংশ ট্রাস্টে হস্তান্তরের বাধ্যবাধকতা কার্যকর হবে।
আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অর্থ নগদ, শেয়ার বা অন্য যেকোনো সম্পদ আকারে পাওয়া গেলে একই আকারে তা ট্রাস্টে হস্তান্তর করতে হবে।
যদি জয় নগদের পরিবর্তে সামিট কমিউনিকেশনসের শেয়ার পান, তাহলে যত দ্রুত সম্ভব সেই শেয়ারের ৩০ শতাংশ সোফিয়ার ট্রাস্টে দিতে হবে। ট্রাস্ট তখনও গঠিত না হলে, শেয়ার সরাসরি সোফিয়ার নামে হস্তান্তর করা হবে। ট্রাস্ট গঠনের খরচ উভয় পক্ষ সমানভাবে বহন করবেন।
করপোরেট সম্পদের বাইরে, এই চুক্তিতে জয়ের ওপর উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিগত আর্থিক দায়ও আরোপ করা হয়েছে। “মোনেটারি অ্যাওয়ার্ড” শিরোনামের একটি অংশে বলা হয়েছে, জয়কে ২০২৫ সালের ১ জুনের মধ্যে ক্রিস্টিন ওয়াজেদকে করমুক্ত এককালীন ১০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ১২ কোটি ২৯ লাখ ৩৮ হাজার ২০০ টাকা) পরিশোধ করতে হবে।
এছাড়া, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে প্রতি মাসের প্রথম দিনে ক্রিস্টিনকে ২০ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ২৪ লাখ ৫৮ হাজার ৭৬৪ টাকা) ভরণপোষণ দিতে হবে, যা চলবে ২০৩৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। পুরো সময়জুড়ে এর পরিমাণ দাঁড়াবে ২৫ লাখ ডলারেরও বেশি (প্রায় ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৫৯ হাজার ৩৭৫ টাকা)।
চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ভরণপোষণের অর্থ ও সময়সীমা “পরিবর্তনযোগ্য নয়”।
তবে উভয় পক্ষের কারও মৃত্যু, ক্রিস্টিন ওয়াজেদের পুনর্বিবাহ, অথবা এক বছর বা তার বেশি সময় ধরে বৈবাহিক সম্পর্কের মতো সহবাসে থাকলে এই অর্থপ্রদান বন্ধ হবে।
এছাড়া, ভার্জিনিয়ার শিশু ভরণপোষণ নীতিমালা অনুযায়ী, জয়ের মেয়ে সোফিয়ার জন্য প্রতি মাসে ৩ হাজার ৪০০ মার্কিন ডলার (প্রায় ৪ লাখ ১৭ হাজার ৯৮৯ টাকা ৮৮ পয়সা) প্রদান করার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
নথিতে বলা হয়েছে, সন্তান ১৮ বছর পার করলেও যদি সে পূর্ণকালীন উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়, স্বনির্ভর না হয় এবং ভরণপোষণ গ্রহণকারী অভিভাবকের সঙ্গে বসবাস করে, তাহলে সহায়তা অব্যাহত থাকতে পারে।
এছাড়া, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই গুরুতর ও স্থায়ী শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধকতা থাকলে ১৮ বছরের পরও সহায়তা চালু রাখার সুযোগ রয়েছে।
এই সমঝোতা নথি প্রকাশের ঘটনা এমন সময় সামনে এলো, যখন জয়ের বিদেশি সম্পদ ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে তদন্ত চলছে।
বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যুক্তরাষ্ট্রে জয় ও তার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পত্তি, বিলাসবহুল গাড়ি এবং সম্ভাব্য অর্থপাচারের অভিযোগ তদন্ত করছে।
তবে জয় সব ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।
উল্লেখ্য, এফবিআইয়ের রিপোর্ট অনুযায়ী, সজীব ওয়াজেদ জয় ও তার মা শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার পাচারের সঙ্গে জড়িত। এই টাকা স্থানান্তরের জন্য কয়েকটি সন্দেহজনক ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ব্যবহার ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। ফেডারেল তদন্তের ফলে এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই মামলা তদন্ত শুরু করে।
প্রতিবছর সজীব ওয়াজেদ জয় তার তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বছরে ২৪০,০০০ ডলার (দুই লক্ষ চল্লিশ হাজার মার্কিন ডলার), ১০ বছরে সর্বমোট ২.৪ মিলিয়ন ডলার প্রদান করবেন। এছাড়াও চুক্তিটি স্বাক্ষরের সময় ১জুন, ২০২৫ এর মধ্যে ট্যাক্স ফ্রি ১ মিলিয়ন ডলার প্রদান করবেন বলেও চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। হাসিনা সরকারের শাসনামলে ব্যবসায়ীকভাবে লাভবান হয়েছে যে কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী তাদের মধ্যে সামিট গ্রুপ অন্যতম। আবার হাসিনার পুত্রেরই রয়েছে সামিটের সাথেই ব্যবসায়ীক অংশীদারিত্