নেই শুনানি, নেই মেয়রের অনুমোদন! কর্মকর্তার কলমের খোঁচায় কয়েক কোটি টাকার ‘কর’ কমতে কমতে নেমে আসে মাত্র কয়েক লাখে। আর এভাবেই নিঃশব্দে উধাও হয়ে যায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। আর অবসর গ্রহণের পর অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত কর্মকর্তারাও যেন বাদ পড়ে যায় চোরের তালিকা থেকে।
তবে এবার আর শেষ রক্ষা হলো না দুর্নীতিতে জড়িত সাবেক কর্মকর্তাদের। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অডিট শাখার নিরীক্ষা দলের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভেতরে কলমের খোঁচায় কর কমানোর এই ভয়াবহ কারসাজির চিত্র।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অডিট শাখার নিরীক্ষা সূত্রে জানা যায়, চসিকের রাজস্ব বিভাগের সাবেক দুই কর কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিন ও রূপন কান্তি চৌধুরী বিধি লঙ্ঘন করে দুটি তিন তারকা হোটেলকে অবৈধ সুবিধা দিয়েছেন। এতে চসিকের প্রায় ১০ কোটি ২৭ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
চসিক সূত্রে জানা যায়, অবৈধ সুবিধা পাওয়া দুটি তিন তারকা হোটেলের নাম- আগ্রাবাদ হোটেল লিমিটেড ও সেন্ট মার্টিন হোটেল লিমিটেড।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা দলের জমা দেওয়া প্রতিবেদনে জানায়, কর নির্ধারণ থেকে শুরু করে আপিল নিষ্পত্তি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াই নিয়মবহির্ভূতভাবে পরিচালিত হয়েছে, যা প্রশাসনিক দুর্নীতির স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
এছাড়াও চসিকের অঞ্চল-৭ এর ২০২২-২০২৩ ও ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের এই নিরীক্ষায় বলা হয়, বিধি অনুযায়ী আপিল রিভিউ বোর্ডের শুনানি ও মেয়রের অনুমোদন বাধ্যতামূলক হলেও তা মানা হয়নি।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, নগরীর ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের গোসাইল ডাঙ্গায় অবস্থিত আগ্রাবাদ হোটেল লিমিটেডের বার্ষিক গৃহকর প্রথমে ৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে ২০১৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর আপিলের পর তৎকালীন কর কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিন কোনো ধরনের নিয়মনীতি অনুসরণ না করে নিজ হাতে তা কমিয়ে ৮৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করেন।
হোল্ডিং ট্যাক্স রেকর্ড, আপিল ফরম, প্রসিডিং, ফিল্ড বুক, অ্যাসেসমেন্ট লিস্ট ও ট্যাক্স লেজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, “সিটি কর্পোরেশন ট্যাক্সেশন রুলস, ১৯৮৬”-এর ১১ ও ১২ ধারা অনুযায়ী মেয়রের নেতৃত্বে রিভিউ কমিটির মাধ্যমে শুনানি হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে।
এতে এক ধাক্কায় ৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা কর কমানো হয়েছে, যা সরাসরি চসিক ও সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই ওয়ার্ডে অবস্থিত তিন তারকা মানের সেন্ট মার্টিন হোটেল লিমিটেডের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়ম ধরা পড়ে। প্রতিষ্ঠানটির গৃহকর প্রথমে ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হলেও ২০১৭ সালের ২ অক্টোবর আপিলের পর ২০২২ সালের ১০ মে তৎকালীন কর কর্মকর্তা রূপন কান্তি চৌধুরীর স্বাক্ষরে শুনানির নোটিশ জারি হয়।
এরপর অস্বাভাবিকভাবে কর কমিয়ে ২২ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে কোনো নোটিশ ছাড়াই দ্বিতীয়বার আপিল নিষ্পত্তি দেখিয়ে তা আরও কমিয়ে ১৮ লাখ টাকায় নামানো হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় আপিল রিভিউ বোর্ডের চেয়ারম্যান তথা মেয়রের অনুমোদন ছিল না বলে জানা যায়।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, এই ঘটনায় ৩ কোটি ১২ লাখ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে, যা “অস্বাভাবিক” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, দুই ক্ষেত্রেই “সিটি কর্পোরেশন ট্যাক্সেশন রুলস, ১৯৮৬”-এর ১১ ও ১২ ধারা লঙ্ঘন করে আপিল নিষ্পত্তির নামে কর কমানো হয়েছে। বাধ্যতামূলক রিভিউ কমিটি ও মেয়রের অনুমোদন ছাড়াই নেওয়া এসব সিদ্ধান্ত সরাসরি বিধিবহির্ভূত।
নিরীক্ষা দলের দাবি, কর কর্মকর্তারা করদাতাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে কর কমিয়েছেন, যা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং সংশ্লিষ্টদের সুস্পষ্ট যোগসাজশের ইঙ্গিত।
এ ধরনের অনিয়মে একদিকে চসিক বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলো অবৈধ সুবিধা পাচ্ছে। ফলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের রাজস্ব বিভাগের অঞ্চল-৭ এর বর্তমান কর কর্মকর্তা এ.কে.এম. সালাহউদ্দিন জানান, আগ্রাবাদ হোটেল লিমিটেড ও সেন্ট মার্টিন হোটেল লিমিটেডের গৃহকর কমানোর ঘটনায় আইন কর্মকর্তা মহিউদ্দিন মুরাদকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে চসিক।
তবে তদন্ত কমিটির মতামত ও এ ঘটনায় কি ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে সে বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন ও আইন উপদেষ্টা মহিউদ্দিন মুরাদের মোবাইলে একাধিকবার চেষ্টা ও হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।