জনস্বাস্থ্য বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মসহ রাজশাহী জনস্বাস্থ্য বিভাগকে জিম্মি করে রাখার অভিযোগ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে জমেছে অভিযোগের পাহাড়। এরপরও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর এই প্রকৌশলীর দাপট একটুও কমেনি।
রোববার বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ফরহাদ হোসেন নামের একজন ঠিকাদার স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজশাহী জনস্বাস্থ্যের নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের একজন সুবিধাভোগী দোসর। গোপনে দরপত্রের রেট ফাঁস করে এখনো আওয়ামী লীগের ঠিকাদারদের কাজ দিচ্ছেন এই নির্বাহী প্রকৌশলী। তিনি অফিস সময়কে তোয়াক্কা করেন না। রাতে বাসবভনে বসান দপ্তর। কোনো দিন অফিসে আসলে পোষা কুকুর নিয়ে ঢুকেন। কুকুরের ভয়ে তটস্থ থাকেন কর্মকর্তা কর্মচারীরা। তদন্তসাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে উপদেষ্টা বরাবর দেওয়া অভিযোগে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ প্রায়ই অফিস করেন না। অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীদের ডেকে নিয়ে সন্ধ্যার পর বাসভবনে দাপ্তরিক কাজ শুরু করেন। বাধ্য হয়ে অধস্তনরা নির্বাহী প্রকৌশলীর বাসভবনে গভীর রাত অবধি কাজ করতে বাধ্য হন। ঠিকাদারদের বিল আটকে অনৈতিক সুবিধা আদায় করেন। গোপালগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা কামাল হোসেনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সম্প্রতি আরও ১১ কোটি টাকার কাজ দিয়েছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ ফ্যাসিস্ট সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের একনিষ্ঠ সমর্থক ও সুবিধাভোগী। গত বছর আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ দাপটের সঙ্গে স্বেচ্ছাচারিতা অব্যাহত রেখেছেন। হারুন অর রশিদ ২০২২ সালের আগস্টে রাজশাহী জনস্বাস্থ্য বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে যোগদান করেন। গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কোনো কাজ আওয়ামী লীগপন্থি ঠিকাদার ছাড়া কাউকে দেননি। আওয়ামী লীগ সরকার চলে গেলেও হারুনের স্বেচ্ছাচারিতা একটুও কমেনি।
বৃহস্পতিবার অফিস শেষ না করেই গ্রামের বাড়ি পাবনায় রওনা করেন। তিন দিন বাড়িতে কাটিয়ে সোমবার বিকালে ফেরেন রাজশাহীতে। সঙ্গে নিয়ে যান সরকারি গাড়ি। সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত অফিস হলেও নির্বাহী প্রকৌশলী ইচ্ছামতো বিকাল ৩টার পর অফিসে ঢুকেন। সঙ্গে নিয়ে আসেন বাসায় পোষা একটি বিদেশি কুকুর। এই কুকুরের ভয়ে তটস্থ থাকেন অফিসের অন্য কর্মকর্তা কর্মচারীরা। তিনি অফিসে কোনো ফাইল দেখেন না। এক দেড় ঘণ্টা পর বাসায় চলে যান।
উপদেষ্টাকে দেওয়া অভিযোগে আরও বলা হয়, নির্বাহী প্রকৌশলী জনস্বাস্থ্য কম্পাউন্ডে সরকারি বাসার শয়ন কক্ষে পিকনিক মুডে রাতে শুরু করেন দাপ্তরিক কাজ। অফিসের হিসাবরক্ষক শফিকুল ইসলাম ও কম্পিউটার অপারেটর সিরাজুল ইসলাম এবং এস্টিমেটর উম্মে সালমা নির্বাহী প্রকৌশলীর শয়ন কক্ষের দপ্তরে কাজ করেন গভীর রাত পর্যন্ত। অধস্তনরা সকাল সাড়ে ৯টায় অফিসে হাজির হন। সারা দিন অফিস করে রাতে আবার নির্বাহী প্রকৌশলীর বাসভবনে অফিস করেন। চাকরি রক্ষায় তারা নীরবে এসব স্বেচ্ছাচারিতা সহ্য করতে বাধ্য হন। এমনকি নির্বাহী প্রকৌশলী হারুনের পাবনার বাড়িতে গিয়েও ফাইলপত্র স্বাক্ষর করিয়ে আনতে হয় কর্মচারীদের। জনস্বাস্থ্যের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী তাকে একাধিকবার অফিস সময়ে অফিসে থাকার জন্য চিঠি দিলেও তাতে কর্ণপাত করেননি তিনি। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নির্বাহী প্রকৌশলী হারুনের বিরুদ্ধে একাধিকবার প্রধান কার্যালয়ে রিপোর্ট করেন; কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হয়নি।
অভিযোগনামা থেকে আরও জানা গেছে, নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ কট্টর আওয়ামী ভাবাপন্ন কর্মকর্তা। গত ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে এক বন্ধুর পোস্টে নির্বাহী প্রকৌশলী তার ভেরিভাইড ফেসবুক আইডি থেকে লেখেন- ‘গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি’। এ নিয়ে কর্মকর্তা কর্মচারীদের মাঝে কানাঘুষা হলেও তিনি কোনো তোয়াক্কা করেননি।
এদিকে নির্বাহী প্রকৌশলীর বন্ধু সাদের ফেসবুক আইডি খুঁজে দেখা গেছে, তিনি আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থক এবং নির্বাহী প্রকৌশলীর নিকটাত্মীয়।
জানা গেছে, নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিজের লোকজনকে কাজ দিয়ে অঢেল অর্থ হাতিয়েছেন। বর্তমানেও সে ধারা অব্যাহত রয়েছে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে আওয়ামীপন্থি ঠিকাদারকে কাজ দিচ্ছেন। চলতি বছরের মার্চে গোপন রেট জানিয়ে দিয়ে গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের নেতা কামাল হোসেনের প্রতিষ্ঠান মেসার্স মনির ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেডকে ১০টি গ্রুপের ১০টি কাজই দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে কামালের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার মাধ্যমে সরকারি নির্দেশনা লঙ্ঘন করা হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাদের পূর্ববর্তী কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করতে পারেনি, ওই সব ঠিকাদারকে নতুন করে কাজ দেওয়া যাবে না; কিন্তু নির্বাহী প্রকৌশলী সেই নির্দেশনা অমান্য করে একই ঠিকাদারকে আবারও কাজ দিয়েছেন। জেলার গোদাগাড়ী উপজেলায় ২০২২ সালের ১৮ কোটি টাকার প্ল্যানটেশনের কাজ এখনো শেষ হয়নি। নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে সখ্যতা থাকায় ২০২২ সালের কাজ নানা অজুহাতে ২০২৫ সালে শুরু করেন। এছাড়া জেলার নয়টি উপজেলায় এখনো ৪০ শতাংশ কাজ অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এর ফলে বাড়ছে জনভোগান্তি।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ নেতা কামালের অন্যতম ব্যবসায়িক পার্টনার নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন।
নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ দীর্ঘ সময় বিল আটকিয়ে ঠিকাদারদের হয়রানি করেন। এরপর তিনি ঠিকাদারদের চেক দেয়ার সময় বিলের এক শতাংশ উৎকোচ দিতে বাধ্য করান। এ কারণে তিনি ইতোমধ্যে মিস্টার ওয়ান পারসেন্ট হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। এ অনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি বছরে কোটি টাকার ওপর হাতিয়ে নেন। ঠিকাদারদের সময়মতো বিল আটকানো ছাড়াও তিনি জামানতের টাকা ফেরত দিতে নানা কৌশলের আশ্রয় নেন। এরপর টাকা ছাড়ের জন্য মোটা অঙ্কের অনৈতিক সুবিধা নেন। আর নির্বাহী প্রকৌশলীর নানা অপকর্মের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া মোটা অঙ্কের অবৈধ টাকা এস্টিমেটর সালমার স্বামী মামুনের অ্যাকাউন্টে জমা হয়।
মামুন রাজশাহী মহানগরীর উপকণ্ঠ গুড়িপাড়া চালনা সাকো এলাকার বাসিন্দা। স্থানীয় হওয়ার কারণে মামুন তার অ্যাকাউন্টে অবৈধ টাকার লেনদেন করতে তোয়াক্কা করেন না। সুষ্ঠু তদন্ত করলেই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে এবং বিষয়টির যথার্থতা পাওয়া যাবে।
তবে নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি নিয়মিত অফিস করি। শারীরিক সমস্যার কারণে অফিসে যেতে কিছুটা দেরি হয়। আর এ কারণে কিছু সময় সরকারি কোয়ার্টারে দাপ্তরিক কিছু কাজ করতে হয়। গোপন রেট জানানোর অভিযোগও ভিত্তিহীন। ঠিকাদারদের বিল বা জামানত আটকিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ ঠিক নয়। যেসব ঠিকাদার কাজ পান না, তারাই এ ধরনের অপপ্রচার করছেন। আমার রাজশাহীতে তিন বছর হয়েছে। নিজেই এ অফিস থেকে বদলির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানিয়েছি।
তবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর রাজশাহী সার্কেলের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমি রংপুর সার্কেলে দায়িত্বে আছি। রাজশাহীতে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করি। নির্বাহী প্রকৌশলী হারুনের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ আসায় আমি বিব্রত। তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও ফোন ধরেন না। অফিসেও সময়মতো উপস্থিত হন না। তাকে রাজশাহী থেকে অন্যত্র বদলির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করেছি। তাকে বদলি করার প্রস্তাব প্রধান প্রকৌশলীর দফতর থেকে মন্ত্রণালয়ে গেছে বলে শুনেছি।