অভাবের তাড়নায় ঢাকায় এসে একসময় ফুটপাতে পান-সিগারেট বিক্রি করতেন ইউসুফ। ১৯৯৮ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে গাড়িচালক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। বছর তিনেক পর চাকরি চলে যায় রাজস্ব খাতে। এরপরই যেন বদলে যায় তার ভাগ্যের চাকা। সরকারি প্রতিষ্ঠানে ১৬তম গ্রেডের গাড়িচালক হিসেবে কর্মরত থাকলেও অনিয়ম, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যবসা, বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট ও জমিসহ বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা এসব সম্পদের কিছু নিজের নামে, আবার কিছু পরিবারের সদস্যদের নামে কেনার তথ্য পাওয়া গেছে। চাকরিজীবনে বিধি লঙ্ঘন, বরখাস্ত ও কারাভোগের ঘটনাও রয়েছে তার জীবনে। রয়েছে নারী কর্মচারীদের হয়রানির অভিযোগও। অভিযোগ রয়েছে, গত ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন স্বাস্থ্য খাতের আলোচিত ‘মাফিয়া ড্রাইভার’ মালেকের এই শিষ্য।
জানা গেছে, ইউসুফের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার প্রত্যন্ত চর মোহনা গ্রামে। কৃষক পিতা মো. আমিনের বড় ছেলে তিনি। লেখাপড়ার সুযোগ না পেয়ে এবং অভাবের তাড়নায় ঢাকায় এসে আসাদগেট এলাকায় পান বিক্রি শুরু করেন। এরই ফাঁকে শিখে নেন হালকা যান চালানো।
১৯৯৮ সালের ৪ জুন ১৮ জেলা হাসপাতাল প্রকল্প চালু হলে সেখানে চাকরির সুযোগ পান ইউসুফ। চাকরিজীবনের প্রথম পোস্টিং ছিল নাটোর সদর হাসপাতালে। সেখানে তিন বছর চাকরি করার পর বদলি হয়ে প্রকল্পের প্রধান কার্যালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ঢাকায় আসেন। পরে চাকরি রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত হলে তার পোস্টিং হয় সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে অ্যাম্বুলেন্স চালাতেন ইউসুফ।
২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়ার সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। অ্যাম্বুলেন্স চালানোর পাশাপাশি উত্তম কুমার বড়ুয়ার ব্যক্তিগত লেনদেনসহ বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করতেন তিনি। পাশাপাশি তার নাম ভাঙিয়ে নানা ধরনের তদবির ও ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজ করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। সরকারি অ্যাম্বুলেন্স ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
২০১৩ সালের ২০ অক্টোবর প্রশিক্ষণের জন্য কয়েকজন নার্সকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছে দেন ইউসুফ। নার্সদের সেখানে নামিয়ে দেওয়ার পর তিনি চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে একটি অনুষ্ঠানের বিলবোর্ড, ব্যানার, গেঞ্জি ও লিফলেট অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যান। বিষয়টি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হলে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এ ঘটনায় তৎকালীন সহকারী পরিচালক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়ার সঙ্গে ইউসুফের দূরত্ব তৈরি হয়।
পরে উত্তম কুমার বড়ুয়া মৌখিকভাবে তৎকালীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ড্রাইভার সমিতির সভাপতি মালেকের কাছে অভিযোগ করেন। তবে মালেক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাকে প্রশ্রয় দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে ইউসুফকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। একই সময়ে তার বিরুদ্ধে একটি সন্ত্রাসবিরোধী মামলাও হয়। সে মামলায় তিনি প্রায় দুই মাস কারাভোগ করেন।
এরপর উত্তম কুমার বড়ুয়ার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হলে তাকে শায়েস্তা করতে ইউসুফ বিএনপির রাজনীতির দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তীতে ২০১৮ সালে মালেকের মাধ্যমে তদবির করে চাকরি ফিরে পান ইউসুফ। এরপর সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) পোস্টিং নিয়ে ঢাকায় আসেন। ইপিআই থেকে বেতন তুললেও তিনি ডিউটি করতেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হাসপাতাল শাখার উপসচিব এবং পরবর্তীতে যুগ্ম সচিবের গাড়িচালক হিসেবে। ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত যুগ্ম সচিবের গাড়ি চালিয়েছেন তিনি।
৫ আগস্টের পর পোস্টিং নিয়ে আবারও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ফেরেন ইউসুফ। এরপর আগের মামলাকে রাজনৈতিক পরিচয় তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে নিজেকে বিএনপির বড় নেতা হিসেবে পরিচিত করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে তার প্রভাব-প্রতিপত্তি আরও বেড়ে যায় এবং তিনি সেখানে ‘রামরাজত্ব’ কায়েম করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানে তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. জালাল উদ্দিন রুমির গাড়িচালক হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন। নির্বাচিত না হয়েও নিজেকে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য বিভাগীয় সরকারি গাড়িচালক কল্যাণ সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির বর্তমান সভাপতি হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ইপিআই, আইপিএইচ, আইইডিসিআরসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বদলি বাণিজ্য, বদলির হুমকি দিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা এবং আউটসোর্সিং ঠিকাদারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ আদায়সহ নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ‘রামরাজত্ব’ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি চাকরিতে কর্মরত থাকা অবস্থায় ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের ক্ষমতাসীন দলের দুর্যোগ ও ত্রাণবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্বেও রয়েছেন তিনি। সরকারি চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার এ বিষয়টি বিধিসম্মত কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘ফাহিম এন্টারপ্রাইজ’ নামে তার একটি রেন্ট-এ-কার ব্যবসা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সাইনবোর্ড ও ভিজিটিং কার্ডে মালিক হিসেবে মো. ইউসুফের নাম এবং তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি সারা দেশে রোগীদের সেবায় ২৪ ঘণ্টা নিয়োজিত এবং মৃতদেহ বহন করা হয়। পাশাপাশি এসি ও নন-এসি অ্যাম্বুলেন্স, আইসিইউ, কোস্টার ও মাইক্রোবাস ভাড়া দেওয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে।