• সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪৭ অপরাহ্ন

পিরোজপুরে চাচাকে পিতা সাজিয়ে ভূমিদস্যু মানসুরের জাল-জালিয়াতি

স্টাফ রিপোর্টার / ২১৫ Time View
Update : রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬

পিরোজপুরে মৃত চাচাকে পিতা সাজিয়ে দলিল জালিয়াতি করে সম্পত্তি দখলের এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা বেরিয়ে এসেছে। মোঃ মানসুর শেখ নামের এক ব্যক্তি তার মৃত চাচা আঃ রাজ্জাক শেখকে নিজের পিতা মোঃ রাজে আলী শেখের সাথে একই ব্যক্তি দেখিয়ে ভুয়া দলিল তৈরি করে সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করেছেন। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র পর্যালোচনা থেকে জানা যায়, পিরোজপুরে সদর উপজেলার আলমকাঠী গ্রামের সরব আলী শেখের ছিলো দুই স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী সোনা বিবির তিন সন্তান: মোঃ রাজে আলী শেখ, আঃ রাজ্জাক শেখ ও রহিমোন বিবি। দ্বিতীয় স্ত্রী বরুজান বিবির একমাত্র সন্তান আজিমোন বিবি। সরব আলী শেখ তার জীবদ্দশায় পারিবারিক বিবাদের কারণে নিজের সমস্ত সম্পত্তি ছেলে-মেয়ের মধ্যে ভাগ করে দেন। আলমকাঠী মৌজার সম্পত্তি বাড়ি বড় ছেলে মোঃ রাজে আলী শেখ ও বড় মেয়ে রহিমোন বিবিকে এবং ব্রাহ্মনকাঠী মৌজার সম্পত্তি ছোট ছেলে আঃ রাজ্জাক শেখ ও ছোট মেয়ে আজিমোন বিবিকে লিখিত দলিলের মাধ্যমে বন্টন করে দেন। আত্মীয়-স্বজনরা এই দলিলের সাক্ষী ছিলেন।
কিন্তু ১৯৬২ সালে বি.এস. মাঠ জরিপের সময় মোঃ রাজে আলী শেখ অসুস্থ থাকায় তার শ্যালক মোঃ মফিজ উদ্দিন মৃধা জরিপ কাজে যান। তিনি ভুমি কর্মকর্তাকে  লিখিত দলিল দেখালেও আঃ রাজ্জাক শেখের মৃত্যুর কথা বলেন নাই, ফলে মৃত আঃ রাজ্জাক শেখের নামেও রেকর্ড হয়। এরপর মোঃ রাজে আলী শেখের ছেলে মানসুর শেখ সেই লিখিত দলিল সহ অন্যান্য কাগজপত্র তাদের ঘর থেকে চুরি করে নিয়ে যান এবং তার বাবা রাজে আলী শেখকে দিয়ে তার বড় ভাই আবুয়াল শেখ ও ছোটা নুরুল আমিন শেখের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করান।
এদিকে মানসুর শেখ গোপনে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করে একটি রেজিষ্ট্রি দলিল তৈরি করেন। এই দলিলে দাতা হিসাবে তার পিতা মোঃ রাজে আলী ওরফে আঃ রাজ্জাক শেখ নাম লেখান। ৩০আগষ্ট-২০০৪ তারিখে এই দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়। পরে পিরোজপুর আদালতে প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে একটি এফিডেভিট করে রাজে আলী ওরফে আঃ রাজ্জাক শেখ একই ব্যক্তি প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। তবে, বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত ও তদন্ত রিপোর্টে পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হয় যে, মোঃ রাজে আলী শেখ এবং আঃ রাজ্জাক শেখ দুই সহোদর ভাই। আঃ রাজ্জাক শেখ ১৯৬৩ সালের ১৭ই মে মারা যান। পিরোজপুর পৌর তহসিলদার এমদাদুল হক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) পিরোজপুরের তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, মোঃ রাজে আলী ওরফে আঃ রাজ্জাক শেখ একই ব্যক্তি নন। মানসুর আলীর এন.আই.ডি কার্ড, পাসপোর্ট, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং তার নিজের কেনা দলিলের নথিতে পিতার নাম মোঃ রাজে আলী শেখ লেখা আছে।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এর আদালতে মানসুর আলী ২১১১ নং সাব কবলা দলিল দিয়ে একটি মামলা করেন। কিন্তু আদালত এই মামলা খারিজ করে দেন, কারণ দলিলে রাজে আলী ওরফে আঃ রাজ্জাক শেখ নাম লিখে শঠতা করা হয়েছিল। এই খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মানসুর আলী আপিলও করেননি, যা তার প্রতারণার আরেকটি প্রমাণ।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) পিরোজপুর সদরের সরেজমিন তদন্তে দেখা যায়, বিএস ৯১ খতিয়ানের রেকর্ডীয় মালিক আব্দুর রাজ্জাক শেখের নিকট থেকে ৩০আগষ্ট-২০০৪ তারিখের ২১১১ নং কবলা দলিলের মাধ্যমে ১.৬০ একর জমি খরিদ করে মানসুরের নামে ৬২৭ নং খারিজ খতিয়ান খোলা হয়। তবে, তদন্তে প্রমাণিত হয় যে, ২১১১/২০০৪ নম্বর কবলা দলিলের দাতা মো রাজে আলী ওরফে আ: রাজ্জাক শেখ একই ব্যক্তি নন। আঃ রাজ্জাক শেখ ও মোঃ রাজে আলী দুই সহোদর ভাই। বর্তমানে এই দলিল বাতিলের জন্য পিরোজপুর সদর বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে ৭৩/২০২৫ নম্বর দেওয়ানী মামলা এবং বিজ্ঞ অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৫৮৫/২০২৪ নম্বর সি আর মামলা চলমান আছে। উভয় মামলার বাদী মোঃ আবুয়াল শেখ। এই ঘটনা পিরোজপুরে ভূমি জালিয়াতির এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category