সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে সরকার গঠনের পথে থাকা বিএনপি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যে কাজগুলোর কথা বলছে, তার শীর্ষে রয়েছে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ। দলটির রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা প্রস্তাব ও ৫১ দফার নির্বাচনী ইশতেহারে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এমনকি জয়লাভের পর গতকাল শনিবার ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনেও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ভিন্নমত ও দলের সবার সহযোগিতা চেয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হলে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের আগে নিজ নিজ অবস্থানকে প্রশ্নাতীত রাখতে হবে। নির্বাচনী অঙ্গীকার ও জুলাই সনদের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো চর্চা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ লেনদেন বন্ধ করা এবং ব্যক্তিস্বার্থে সম্পদ বৃদ্ধির সংস্কৃতি রোধ- এসব বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে সরকারকে।
বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও দুর্নীতি দমন আইন সংস্কারের পাশাপাশি পদ্ধতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে দুদকের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সংস্কারগুলোকে দলটি পর্যাপ্ত মনে করে না।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারপক্ষ বা বিরোধীপক্ষ- সব ভোটারই দুর্নীতিমুক্ত সরকার প্রত্যাশা করেন। নতুন সরকারকে তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার ও জুলাই সনদের ঘোষিত প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে হবে। তিনি আরও বলেন, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও দলীয় নেতাকর্মীদের মনে রাখতে হবে- রাজনীতি মুনাফাভিত্তিক বিনিয়োগের ক্ষেত্র নয়। ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষা বা
আমলাতান্ত্রিক সুবিধা বিস্তারের জন্য নয়; বরং জনস্বার্থে দায়িত্ব পালনের জন্যই জনগণ তাদের ক্ষমতায় বসিয়েছে। জনগণের ওপর বাড়তি বোঝা চাপিয়ে নয়, বরং জনগণের কাছে জবাবদিহির মাধ্যমে সরকার পরিচালনা করতে হবে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘চোরতন্ত্র’ পতনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে দেশে দলবাজি, দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও মামলা-বাণিজ্যের যে অভিযোগ উঠেছে, তা স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়া উচিত। সরকারের সব সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। জুলাই সনদের ৭৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সব জনপ্রতিনিধি ও মন্ত্রিসভার সদস্যকে দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাসের মধ্যে আয়-ব্যয় ও সম্পদের বিবরণ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে এবং প্রতিবছর তা হালনাগাদ করতে হবে। একই বিধান সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও বাধ্যতামূলক করার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, এ বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য রয়েছে।
দুর্নীতিমুক্ত ব্যক্তিদের নিয়েই সরকার গঠনের তাগিদ দেন দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল) মইদুল ইসলাম। তিনি বলেন, বিতর্কিত, ঋণখেলাপি বা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে- এমন ব্যক্তিদের সরকারে রাখলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। ‘সর্ষের ভেতর ভূত’ থাকলে কঠোর অবস্থান নেওয়া কঠিন হবে। সরকারের আন্তরিকতা প্রমাণ হবে তখনই, যখন দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে- এমন ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে না রাখা হবে। তিনি আরও বলেন, অতীতের সরকারগুলোর মতো শুধু বক্তব্যে নয়, বাস্তব পদক্ষেপে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠবে, অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাকে কোনো দায়িত্বপূর্ণ পদে রাখা উচিত নয়। দুর্নীতির মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দুদকের অধীনে আলাদা আদালত গঠনেরও প্রস্তাব দেন তিনি।
দুর্নীতিবিরোধী জাতীয় সমন্বয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক জেলা জজ ড. শাহজাহান সাজু মনে করেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্বে সৎ ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের বসাতে হবে। পাশাপাশি কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি তদারকি থাকতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সহজ কাজ নয়। প্রতিটি খাতে নজরদারি জোরদার না করলে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসবে না। তাই নতুন সরকারের জন্য দুর্নীতি দমন শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বড় ধরনের প্রশাসনিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জও বটে।