• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪১ অপরাহ্ন
সর্বশেষ:
জমি, পাঁচতলা বাড়ি, স্ত্রীর নামে নগদ টাকাসহ যত অবৈধ সম্পদ ওয়াসার গাড়িচালক তাজুলের দুর্নীতির মামলায় সাবেক কর কর্মকর্তা শ্যামলের ৫ বছরের কারাদণ্ড স্বাস্থ্য খাতকে দুর্নীতির মাধ্যমে ভেঙে দিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী বেনজীরের দুর্নীতির মামলায় ১২ জনের সাক্ষ্য মোদি–আদানির সম্পর্ক আর দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র প্রকাশে আদালতের নিষেধাজ্ঞা দুর্নীতির মামলা: সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন ২০ জানুয়ারি এনবিআরের চেয়ারম্যান হলেন আহসান হাবিব ঘুস-দুর্নীতির অভিযোগে মোংলা কাস্টমস কর্মকর্তার অপসারণ দাবি স্ত্রী-শ্যালকসহ সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুলের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা প্রশ্নফাঁসের শাস্তি, সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় বদলি!

কেরানি থেকে পিওন-শতকোটি টাকার আলীশান ভবনের ছড়াছড়ি

স্টাফ রিপোর্টার / ৪৩৯ Time View
Update : রবিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২৬

সরকারি কর্মচারীদের আলীশান ভবন ও অভিজাত ফ্ল্যাট–অ্যাপার্টমেন্টে ভরে গিয়ে যেন আরেক ‘বেগমপাড়া’তে পরিণত হয়েছে ময়মনসিংহ নগরী। বিভাগের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কেরানি, ক্যাশিয়ার, হাসপাতালের উচ্চমান সহকারী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, পুলিশের সাবেক ওসি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা, সরকারি কলেজের শিক্ষক, ভূমি কর্মকর্তা, সার্ভেয়ার এমনকি তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির এমএলএসএস–পিওনরাও মিলেমিশে গড়ে তুলেছেন ৮ থেকে ১৬ তলা উচ্চতার বিশাল বহুতল ভবন।

একাধিক কর্মচারী যৌথ মালিকানায় নির্মাণ করেছেন দৃষ্টিনন্দন অ্যাপার্টমেন্ট। ময়মনসিংহ নগরীর গোলকিবাড়ি, আকুয়া মড়লপাড়া (হাজীবাড়ি), আমলাপাড়া, মাসকান্দাসহ নগরীর অন্তত ৪৯টি স্থানে ইতোমধ্যে আলীশান ভবন গড়ে উঠেছে। নির্মাণাধীন রয়েছে আরও শতাধিক ভবন।

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর জনস্বার্থে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ জমা দেন আবুল খায়ের নামের এক ব্যক্তি। অভিযোগের ভিত্তিতে এখন অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এসব আলীশান ভবনের পাশাপাশি বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় সাড়ে পাঁচশ একর জমিও ক্রয় করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অধিকাংশ সম্পত্তির মালিকানা রাখা হয়েছে তাদের স্ত্রী বা পরিবারের সদস্যদের নামে। অনেকেই কানাডা, দুবাই ও ভারতে বাড়ি নির্মাণ করেছেন। কর্মচারীদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে—ময়মনসিংহে গড়ে উঠেছে ‘আরেক বেগমপাড়া’।

তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ১৪৩ জন কর্মচারীর মধ্যে অন্তত ৬৭ জন ‘আলাদীনের চেরাগ’-এর মতো কোটিপতিতে পরিণত হয়েছেন। কারও কারও সম্পদের পরিমাণ শত কোটি টাকাও ছাড়িয়ে গেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

একই কর্মস্থলে বছরের পর বছর, অভিযোগেও নেই কার্যকর ব্যবস্থা

ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহর ও জেলা সদরে বছরের পর বছর কর্মরত এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি বড় অংশ  আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী ও নেতাদের সুপারিশে দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে বহাল ছিলেন। লাগামহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তদন্ত নামমাত্র হয়েছে, ফাইল পড়ে রয়েছে আলমারিতে। হাতে গোনা কয়েকজনের বিরুদ্ধে দায়সারা দুদকের মামলা হলেও প্রভাবশালীরা রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

আলোচিত ভবন ও ‘কোটিপতি’ তালিকা :

ময়মনসিংহ নগরীর গোলকিবাড়ি এলাকায় নির্মিত ১১ তলা ‘স্বপ্ন টাওয়ার’, আকুয়া হাজীবাড়ি মোড়ে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং টাওয়ার’, ‘ইব্রাহিম টাওয়ার’ ও ‘ইউলিটি টাওয়ার’—এই চারটি ভবন নির্মাণ করে আলোচনায় এসেছেন শিক্ষক ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

কোটিপতি হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ক্যাশিয়ার মো. এনামুল হক, ভূমি কর্মকর্তা আব্দুল গনি, যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা শাহীন আলম, পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামসহ অন্তত ৩০ জন।

এছাড়া যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা ফারজানা পারভিন, নুরুজ্জামান চৌধুরী, জোয়াহের আলী মিয়া, নদ্দন কুমার দেবনাথ, নূর মোহাম্মদ, গোলাম মোস্তফাসহ প্রায় ৬৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী অবৈধ অর্থে আলীশান বাড়ি নির্মাণ করে নগরীতে বসবাস করছেন।

শতকোটি টাকার অভিযোগ, দুদকের অনুসন্ধান :

ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, জালিয়াতি ও স্টাফ কোয়ার্টার বরাদ্দে শতকোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দু’টি তদন্ত চলমান।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের সাবেক জেলার ও বর্তমানে নেত্রকোনা জেল সুপার (চলতি দায়িত্ব) আব্দুল্লাহ ইবনে তোফাজ্জল হোসেন খানের নামে রয়েছে চারটি বাড়ি। তিনি জামতলা মোড়ে ৬ শতাংশ জমির ওপর ৭ তলা ভবন নির্মাণ করছেন। নগরীর বিভিন্ন স্থানে পাঁচটি জমি কিনেছেন, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা।

ক্যাশিয়ার এনামুল হক ও যৌথ ভবন :

দুদকের অনুসন্ধানে জানা যায়, ক্যাশিয়ার মো. এনামুল হক ও তার ঘনিষ্ঠ ১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী যৌথভাবে গোলকিবাড়ি এলাকায় ১১ তলা বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করেছেন। এতে ব্যয় হয়েছে আনুমানিক ২৪ কোটি টাকা। এনামুল হক দাবি করেন, ২০১১ সালে তারা ৬ শতাংশ জমি কিনে ধীরে ধীরে ভবন নির্মাণ করেছেন।

উচ্চমান সহকারী সাদেকুল ইসলামের সম্পদের পাহাড়

উচ্চমান সহকারী সাদেকুল ইসলামের সম্পত্তির বিবরণে অনুসন্ধানী টিম বিস্মিত হয়। তিনি ময়মনসিংহের আমলাপাড়া ও গোলকিবাড়িতে ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি ১১ তলা ভবন এবং ৪৫ শতাংশ জমি কিনেছেন। জমি ক্রয়ের দলিল নম্বর ১২০, ২৩০৭, ৫৬৯, ৭০৪, ৭০০ ও ৫৪৫।

তার দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে রাজধানীর উত্তরা সেক্টর–১০ এ ৯ তলা বাড়ি, উত্তরা ও ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকায় আরও সাতটি ফ্ল্যাট রয়েছে। প্রথম স্ত্রী সোনিয়া আক্তার অভিযোগ করে বলেন, অবৈধ অর্থের প্রতিবাদ করায় তাকে উপেক্ষা করে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন সাদেকুল ইসলাম।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. আজীম বিল্লাহ জয়নাল বলেন, “এতদিন শুনতাম কানাডা বা লন্ডনের বেগমপাড়া। এখন শুনছি ময়মনসিংহেও বেগমপাড়া—আর তা গড়েছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই। যাদের জানার দায়িত্ব, তারা না জানলে দায়ভার অন্যদের দিতে হবে।” এ ঘটনা জনস্বার্থে একটি উচ্চ আদালতে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে রীড পিটিশন দাখিল করা হয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category