• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪০ অপরাহ্ন
সর্বশেষ:
জমি, পাঁচতলা বাড়ি, স্ত্রীর নামে নগদ টাকাসহ যত অবৈধ সম্পদ ওয়াসার গাড়িচালক তাজুলের দুর্নীতির মামলায় সাবেক কর কর্মকর্তা শ্যামলের ৫ বছরের কারাদণ্ড স্বাস্থ্য খাতকে দুর্নীতির মাধ্যমে ভেঙে দিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী বেনজীরের দুর্নীতির মামলায় ১২ জনের সাক্ষ্য মোদি–আদানির সম্পর্ক আর দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র প্রকাশে আদালতের নিষেধাজ্ঞা দুর্নীতির মামলা: সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন ২০ জানুয়ারি এনবিআরের চেয়ারম্যান হলেন আহসান হাবিব ঘুস-দুর্নীতির অভিযোগে মোংলা কাস্টমস কর্মকর্তার অপসারণ দাবি স্ত্রী-শ্যালকসহ সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুলের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা প্রশ্নফাঁসের শাস্তি, সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় বদলি!

পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নাসির গড়েছেন সম্পদের পাহাড়

ফারহান / ৫৪৩ Time View
Update : শনিবার, ১৭ জানুয়ারী, ২০২৬

চার পাঁচ বছর আগে ছিলেন গ্রাম্য পশু চিকিৎসক। শ্বশুর বাড়িও বেড়াতে যেত না ভাড়ার অভাবে। বর্তমানে অবৈধভাবে শত কোটি টাকার মালিক। এমনটা অভিযোগ মাদারীপুর জেলা প্রশাসন কর্তৃক তৈরিকৃত দালালদের শীর্ষ দালাল নাসির কাজী ও তার ডির্ভোসকৃত স্ত্রীর স্বজনদের।

নাসির কাজীর ভয়াবহ দুর্নীতির তথ্য ফাঁস করেন জেলখাটা তার সহযোগীরাও। পলাতক শীর্ষ এই দালালের রয়েছে ঢাকায় একাধিক ফ্লাটসহ বিভিন্ন স্থানে সম্পদের পাহাড়। তার ও স্ত্রীর মোবাইলের ব্যাক কাভারও স্বর্ণেরসহ এলাহি কাণ্ড কারখানার গল্প এখন সহযোগীসহ মানুষের মুখে মুখে। নাসির কাজীকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে মাদারীপুরে পদ্মা সেতুর রেল লাইনসহ বিভিন্ন প্রকল্পে অধিগ্রহণ খাতে দুর্নীতিগ্রস্ত দালাল ও কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিচারের আওতায় এনে সরকারের শত শত কোটি টাকা উদ্ধার সম্ভব হবে বলে আশাবাদ সংশ্লিষ্টদের।

দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ায় জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ২ কর্মচারীকে বাধ্যতামূলক অবসরসহ তহশিলদার ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চললেও নাসির কাজীসহ দালালরা রয়েছেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

সরেজমিন একাধিক সূত্রে জানা যায়, শিবচরের দত্তপাড়া ইউনিয়নের বাচামারা গ্রামের মোজাজ্জেল হকের ছেলে কেএম নাসির (নাসির কাজী) কয়েক বছর ধরেই নিজ বাড়ি থেকে পলাতক রয়েছে। পদ্মা সেতুর বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে নাসির কাজীর নাম শীর্ষে রেখে ২০ দালালের তালিকা করেছে জেলা প্রশাসন। যা দুদকে প্রেরণের পর তদন্তানাধীন রয়েছে। নাসির কাজীর নেতৃত্বে একটি চক্র শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় ভিপি ও খাস সম্পত্তি থেকে দাবি এক সময়ের সহযোগীদের।

ভুয়া নথি ও মালিক সাজিয়ে তিনি বিল উত্তোলনের ক্ষেত্রে সাজান ভুয়া নারী পুরুষদের। এরকমই লোভে পা দিয়ে ২ লাখ টাকা ভাগ পেয়ে জেল খাটেন দত্তপাড়ার ইউপি সদস্য শুধাংস মন্ডল। জেলে রয়েছেন সহযোগী শাহীন বেপারি। নাসির কাজীর টোপে পড়ে স্বাক্ষর দেয়া বাবদ ২ লাখ টাকা দেয়ার কথা থাকলেও ৪৫ হাজার টাকা ভাগ পেয়ে তদন্তের মুখে পড়েছেন আলো পত্তনদারসহ আরও অনেকে। মুকুলী রানী নামের এক নারীকে নাসির গ্রুপ দুই দফায় দুটি বিলে ৪ লাখ টাকা দিলেও বাড়িতে টাকা ফেরতের নোটিশ আসার পর থেকে এখন বাড়িই ছাড়া তিনি।

ভুয়া বিল ছাড়াও অন্যের বিলও তুলে নেন নাসির কাজীসহ দালাল চক্র ও কর্মকর্তা কর্মচারীরা। শিবচরের মাদবরচরের ডাইয়ারয়ার চর মৌজায় পদ্মা সেতুর রেল লাইন প্রকল্পের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে হারুন বেপারি, তার স্ত্রী নুরুন্নাহার বেগম ও ছেলে মেহেরাব হোসেনসহ পার্শ্ববর্তীরা দোকানঘর ও জমির জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ৪ ধারা, ৭ ধারা ও ৮ ধারা নোটিশ পান। তবে নোটিশ পেয়ে ডিসি অফিসে বারবার ঘুরেও বিল পাচ্ছে না এরা। দীর্ঘ চেষ্টার পর ক্ষতিগ্রস্তরা জানতে পারেন ওই দাগগুলো থেকে ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে তুলে নিয়ে গেছে নাসির কাজীর নেতৃত্বে দালালরা ও জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কর্মকর্তা কর্মচারীরা। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় এই ভুয়া বিল উঠানোর অভিযোগে শাহীন বেপারি নামের এক দালালকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি মামলায় আসামি হয় জেলা প্রশাসনের তালিকাভুক্ত শীর্ষ দালাল নাসির কাজী, তার ২ মামা ও এক নিকটাত্মীয়। আসামিদের কেউ ওই এলাকার বাসিন্দা না হওয়া সত্ত্বেও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এক শ্রেণির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সহায়তায় এ দফায় প্রায় ২ কোটি টাকা লোপাট হয়। গ্রেপ্তারকৃত শাহীনের পরিবার (দালাল নাসিরের সহযোগী) আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য দেয়। শাহীনের নামে প্রায় ২ কোটি টাকার বিল ছাড় হলেও লোপাটকৃত টাকার মাত্র ২০ লাখ টাকা ভাগ পায় তারা। বাকি টাকা নেয় নাসিরসহ দালালরা ও অফিসের লোকজন।

নাসির কাজীর সাবেক স্ত্রীর বড় বোন বলেন, শুনছি ও জিরো থেকে হিরো হয়ে গেছে। যেমন ধরেন টোকাই থেকে রাজপ্রাসাদ। ওর বাড়ি থেকে আমার বাবার বাড়ি ১০ টাকা ভাড়া ছিল তা দিয়েও আসতে পারে নাই। এখন ও প্লেনে করে মানুষকে ঘুরতে পাঠায়। আর কয়েকদিন পরপর সে পরিবার নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্লেনে ঘুরতে যায়। বিবাহ বার্ষিকীই পালন করেছে ১৪-১৫ লাখ টাকা খরচ করে। বাচ্চা হওয়ার পর সোনার চামচ সোনার বাটি দেয়। এলাহিকান্ড আর কি ? বলে শেষ করা যাবে না।  ঢাকা, চট্রগ্রামসহ অনেক জায়গায় বাড়িসহ অনেক সম্পদ করছে। ওর এই অপকর্মে অফিসের লোক ছাড়াও ওর মামারা ভাইয়েরাও জড়িত। ও আমাদের আইডি কার্ডও চেয়েছিল আমরা দেয়নি।

ভুক্তভোগী ক্ষতিগ্রস্ত হারুন বেপারি বলেন, আমাদের সকল কাগজপত্র আছে। কিন্তু শাহিন বেপারী নাসির কাজীসহ চারজন কি কাগজপত্র অফিসে দাখিল করে আমাদের ক্ষতিপূরণের এক কোটি ৮৮ লাখ ১৪ হাজার তিনশ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে তা আমরা জানি না। পরে জানতে পেরেছি জাল কাগজপত্র তৈরি করে ওরা টাকা উত্তোলন করেছে। আর এর সঙ্গে ডিসি অফিসের কর্মকর্তারা জড়িত ছিল। দালাল নাসির তার দুই মামাকে যদি ধরা যায় আর সার্ভেয়ার নাসিরকে যদি আইনের আওতায় আনা যায় তাহলে জালিয়াতি করে নেয়া শত শত বিলের শত শত কোটি টাকা আদায় করা সম্ভব হবে বলে আমি মনে করি।

গ্রেপ্তারকৃত ইউপি সদস্য সুধাংশ মন্ডল বলেন, নাসির কাজী এক সময় পল্লী পশু চিকিৎসক ছিল। পশু চিকিৎসা করে দিয়ে দেড়শ-দুইশ টাকা কামিয়ে কোনমতে চলতো। রেল লাইনের ভূমি অধিগ্রহনের সময় ডিসি অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে এখন শতশত কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছে।

আরেক সহযোগী মুকুলী রানী বলেন, নাসির আমাকে বলে আপনাকে বাড়ি গাড়ি সব ব্যবস্থা করে দেব। প্রথমবার ও আমাকে দিয়ে ৬৩ লাখ টাকা ওঠায় আমাকে দেয় ৩ লাখ টাকা। পুনরায় আবার কয়েক লাখ টাকা উঠিয়ে দেয় এক লাখ টাকা। এভাবে ও অফিসের লোক মিলে শত শত মানুষের বিল উঠিয়ে আমাদের মতো গরীব মানুষগুলারে বিপদে ফেলেছে। ওকে ধরলে সব বের হয়ে যাবে ।

নাসিরের মামা প্রতারণার এক মামলার আসামি মো. আলীউজ্জামান বলেন, মামলাটি আমাদের সঙ্গে শত্রুতাবসত দেয়া হয়েছে। আপনার ভাগিনা (নাসির) এত সম্পদের মালিক কিভাবে হলো বা কি ব্যবসা করে? এর কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।

নাসিরের মামা প্রতারণার এক মামলার আসামি মো. আলীউজ্জামান বলেন, মামলাটি আমাদের সঙ্গে শত্রুতাবসত দেয়া হয়েছে। আপনার ভাগিনা (নাসির) এত সম্পদের মালিক কিভাবে হলো বা কি ব্যবসা করে? এর কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।

মাদারীপুর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ঝোটন চন্দ্র চন্দ বলেন, দুর্নীতির প্রমান পাওয়ায় ২ জন স্টাফকে ইতোমধ্যেই বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তা ও তহশিলদারের বিরুদ্ধেও তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আর দালালদের তালিকা দুদকে দেয়া হয়েছে।

মাদারীপুর স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক বলেন, দালাল চক্রের বিরুদ্ধে আমরা সব সময় সোচ্চার আছি। ইতোমধ্যে কিছু দালালের তালিকা করা হয়েছে। পদ্মা সেতুর ভূমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মাদারীপুর পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, নাসির কাজীসহ যারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ হরণ করে জনগণের অধিকারকেও হরণ করেছে। আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এই মামলাটি তদন্ত করছি। যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তারা যত‌ই ক্ষমতাশীল হোক না কেন আমরা তাদেরকে কোন ছাড় দেবো না। আইন প্রয়োগকারী সকল সংস্থা ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের মূল উৎপাটন করা হবে। আইনের পাশাপাশি সামাজিকভাবেও তাদেরকে বয়কট করা হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category