গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) হিসাব সহকারী মো. মনির হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি, ঘুষ গ্রহণ, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি এবং নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও গোয়েন্দা সংস্থাসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন রেজাউল করিম নামের এক ব্যক্তি।
প্রেক্ষাপট ও উত্থান
অভিযোগ অনুযায়ী, মনির হোসেনের পারিবারিক অবস্থা বেশ শোচনীয় ছিল; তার বাবা ছিলেন একজন দিনমজুর। ২০২০ সালে তিনি তদবির ও কূটকৌশলের মাধ্যমে পাউবোতে হিসাব সহকারী হিসেবে যোগ দেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এরপর মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে তিনি সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
অবৈধ সম্পদের বিবরণ ও লুকানোর কৌশল
আইনের চোখ ফাঁকি দিতে মনির হোসেন অত্যন্ত চতুরতার আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি নিজের, বাবা-মায়ের এবং স্ত্রীদের নামে এসব সম্পদ কিনেছেন এবং পরবর্তীতে ‘হেবা’ বা দানপত্র দলিলের মাধ্যমে তা হস্তান্তর করে সম্পদের উৎস আড়াল করার চেষ্টা করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য সম্পদের মধ্যে রয়েছে:
বিলাসবহুল পার্ক:
গাইবান্ধার মদনের পাড়ায় ৭-৮ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি পার্ক নির্মাণ করেছেন। দুর্নীতির টাকা আড়াল করতে জমির মালিকানা বাবা ও নিজের নামে বারবার পরিবর্তন করেছেন, যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৯-১০ কোটি টাকা।
বিপুল জমিজমা:
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ ও ফুলছড়ি (মদনের পাড়া) এলাকায় নিজের, বাবা-মা ও স্ত্রীদের নামে অন্তত ১৫-২০টি দলিলের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকার জমি কিনেছেন। এর মধ্যে অনেক জমি পুনরায় হেবা দলিল করে নিজের বা স্ত্রীদের নামে করে নিয়েছেন।
বগুড়ায় সম্পদ:
বগুড়ার উপ-শহর এলাকায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং ১ কোটি ২০ লাখ টাকা মূল্যের প্রায় ১০ শতাংশ জমি।
গাইবান্ধা পৌরসভা: শহরের ভেতরে ৯০ লাখ টাকা মূল্যের ৭ শতাংশ জমি।
অভিনব উপায়ে ব্যাংক লেনদেন
অবৈধ অর্থের লেনদেন আড়াল করতে মনির হোসেন বিভিন্ন অভিনব কৌশল ব্যবহার করেছেন
নামের মিলের অপব্যবহার: নিজ এলাকার এক মাদরাসা শিক্ষকের নামও ‘মনির হোসেন’ হওয়ায়, তার নামের সুযোগ নিয়ে একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে কোটি টাকার লেনদেন করেছেন।
স্বজনের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে চাচাতো ভাই ইব্রাহিমের ডাচ-বাংলা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমেও কোটি টাকার ওপরে লেনদেন করেছেন।
* **দেশব্যাপী বিভিন্ন ব্যাংকে অর্থ:** ঢাকা (মোহাম্মদপুর, কুড়িল, শনির আখড়া), চট্টগ্রাম (হাটহাজারী), বান্দরবান (থানচি) এবং গাইবান্ধার জনতা, সোনালী ও ন্যাশনাল ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় তার নামে কোটি টাকার ওপর লেনদেন ও ব্যালেন্স রয়েছে।
**## চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা**
বাংলাদেশ সচিবালয়ে কর্মরত দুই আত্মীয় (সাইদার ও ফারুক গাজী)-এর যোগসাজশে তিনি একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
* বিভিন্ন ব্যক্তিকে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তিনি ৫-৬ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
* গাইবান্ধার স্থানীয় অনেক চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে ৫-১০ লাখ টাকা করে নিয়েছেন।
* টাকার পাশাপাশি গ্যারান্টি হিসেবে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে ব্ল্যাংক চেক এবং নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষরও নিয়ে রেখেছেন।
বিতর্কিত ব্যক্তিগত জীবন
দুর্নীতির পাশাপাশি তার ব্যক্তিজীবন নিয়েও চরম বিতর্ক রয়েছে। মাত্র ৩৪ বছর বয়সের মধ্যেই তিনি তিনটি বিয়ে করেছেন:
প্রথম স্ত্রী: গাইবান্ধার কাজল ঢোপ গ্রামের ইতি আক্তার। তাকে তিনি জোরপূর্বক তালাক দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
দ্বিতীয় স্ত্রী: সুন্দরগঞ্জের নিশাত রিমা (বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী)। যৌতুক নেওয়া এবং বিনা অনুমতিতে তৃতীয় বিয়ের কারণে নিশাত রিমা আদালতে একটি মামলা (সিপি-৬৮৯/২৫) দায়ের করেছেন, যা বর্তমানে চলমান।
তৃতীয় স্ত্রী: দ্বিতীয় স্ত্রী থাকা অবস্থাতেই দুই সন্তানের জননী নাসরিন সুলতানাকে ব্ল্যাকমেইল ও ফুসলিয়ে ভাগিয়ে নিয়ে ২০২৫ সালে তিনি তৃতীয় বিয়ে করেন এবং তার নামেও কোটি টাকার সম্পত্তি লিখে দেন।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
দ্বিতীয় স্ত্রী নিশাত রিমা: “সে আমার বাবার কাছ থেকে যৌতুক নিয়েছে, আমাকে না জানিয়ে তৃতীয় বিয়ে করেছে এবং আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। দেনমোহরের টাকা চাইলে উল্টো হুমকি দেয়। বাধ্য হয়ে আমি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি এবং তার কঠোর শাস্তি চাই।”
নির্বাহী প্রকৌশলী (গাইবান্ধা পাউবো): মো. শরিফুল ইসলাম জানান, “আমরা অভিযোগ পেয়েছি। তাকে অফিসিয়ালভাবে শোকজ করা হয়েছিল। তার দেওয়া ব্যাখ্যা আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি।”
অভিযুক্ত মনির হোসেন নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেছেন এই হিসাব সহকারী।